সৎ মানুষের খোঁজে!

Print

রীতা রায় মিঠু 

এটা ২০১৬ সালের কথা। সেবার ফেব্রুয়ারির বইমেলায় আমার লেখা তৃতীয় বই ‘তুমি বন্ধু তুমি সখা’ প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৪তে দেশে গেছিলাম প্রথম বই প্রকাশ উপলক্ষে, ২০১৫তে দ্বিতীয় বই প্রকাশের সময় দেশে যেতে পারিনি। ২০১৬তে ফের দেশে গেছি। প্রথম দিকে আমরা পুরো ফ্যামিলি দেশে যেতাম, পরে সংসারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পুরো পরিবারের একসাথে আর দেশে যাওয়া হয়ে ওঠেনা। ২০১২তে আমার মা যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন আমি একাই দেশে গেছিলাম। সেই থেকে একা একা দেশে যাই।

একা দেশে যাওয়ার একটা বাড়তি সুবিধা আছে, মনের সুখে ঘুরতে পারা যায়। মাও বেঁচে নেই যে পেছন থেকে ট্যাকর ট্যাকর করবে। কাজেই একা আমিই রাণী, আমিই বেগম। দেশে গেলেই আমার বেড়াতে ইচ্ছে করে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বেড়াই, ভারতে যাই। খুব খুব বেড়াই, সঙ্গী হিসেবে আমার ছোট মাসি হচ্ছে দ্য বেস্ট।

দেশে গেছি, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত বেড়াচ্ছি, কলকাতাতেও যাব। কিন্তু ২০১৬তে ছোট মাসী চাকরি থেকে ছুটি পেলেও কলকাতা যাওয়ার ভিসা পায়নি। অগত্যা আমাকে একা একা কলকাতা যেতে হয়েছে। দিন পনেরোর জন্য ঢাকা কলকাতা-ঢাকা মৈত্রী এক্সপ্রেসে চড়ে কলকাতা বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।

ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা যাত্রায় যাত্রীদের মধ্যে দুই প্রান্তে কাস্টমসে ‘ঘুষ’ বা কাস্টমসে চা খাওয়ার পয়সা দেয়ার প্রচলিত ধারণা আছে। চা খাওয়ার পয়সা দিলেই নাকি কোন ঝামেলা ছাড়াই উড়তে উড়তে কাস্টমসের বেড়া ডিঙ্গানো যায়! ঘুষ খাওয়ার ধারণা সম্পর্কে জেনেছি, কিন্তু ঘুষটা কিভাবে খাওয়াতে হয় তা কেউ বলেনি। ঘুষ যদি রসগোল্লা অথবা সত্যিই এক কাপ চা হতো, আমার জন্য সহজ হতো হাসিমুখে কাস্টমসের সবাইকে ভাই বোন ডেকে চা রসগোল্লা দিয়ে আপ্যায়ন করতে চাওয়া। বাঙালিতো আবার আদর আপ্যায়নে পৃথিবী সেরা।

অন্যবার ছোট মাসি সাথে থাকে, যা কিছু করার মাসিই করে ফেলে। তবে মাসিকেতো কখনও কাস্টমস অফিসারদের সামনেই যেতে দেখিনি, ঘুষ দিবে কখন? মাসিও মনে হয় ঘুষ ঘাষ দেয়ার আসল প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানেনা। কারণ এর আগে যতবার কলকাতা গেছি, বাসে চড়ে গেছি। সাথে মাসি ছিল তাই আমাকে কিছুই করতে হয়নি পাসপোর্ট হাতে কাস্টমস অফিসারের সামনে হাসি দিয়ে দাঁড়ানো ছাড়া। তবে যাত্রা সঙ্গী ছোট মাসী কাস্টমস অফিসারদের ঘুষ না দিলেও দুই দেশের দুই প্রান্তের কুলীর সাথে টাকা দিয়ে চুক্তি করতো, কুলী কাস্টমসের বিভিন্ন শাখায় দক্ষিণা দিয়ে আমাদের পার করে দিত।

তা ২০১৬তে আমি জীবনে প্রথমবার একা ট্রেনে চড়ে কলকাতা গেলাম এবং দেশে ফিরেও এলাম। আগেই জেনে গেছি, যাওয়া আসার পথে কাস্টমস অফিসারের হাঁতে ১০০/২০০ টাকা ধরিয়ে দিলে নাকি ওরা ব্যাগ খোলেনা। ব্যাগ খুললেও আমার কোন সমস্যা হতোনা, আমিতো চোরাই মাল নিয়েও যাইনা, সাথে করে নিয়েও আসিনা। ব্যাগ খোলাতে সমস্যা একটাই হয়, গোছানো ব্যাগ একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়, ফিরে গোছাতে কষ্ট হয়। এ কারণেই কিনা জানিনা, অনেকেই অফিসারের হাতে টাকা দিয়ে দেয়।

তো কলকাতা যাওয়ার সময় গেদে কাস্টমসে সবকিছু চেকিং হচ্ছিল। কাস্টমসের বিশাল লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েছি, আমার সামনের ভদ্রলোককে দেখলাম কাস্টমস অফিসারের হাতে কিছু গুঁজে দিল, অফিসারও হাতটা নিজের শার্টের পকেটে বুলিয়ে হাতটা খালি করে পাসপোর্ট লেখায় মন দিলেন। ভদ্রলোক যা গুঁজে দিল তা যে টাকার নোট সেটা চোরা চোখে দেখে নিয়েছি। এটাও শিখে ফেলেছি, ঘুষ তাহলে এভাবে দিতে হয়।
কাস্টমস অফিসার আমাকে ডাকার আগেই হাতে টাকা রেডি রেখেছি, ডাক পেয়েই কাস্টমস অফিসারের সামনে গিয়ে হাসিমুখে ‘হেলো’ বলে পাসপোর্ট এগিয়ে দিলাম।
অফিসার’ আমার পাসপোর্ট দেখলো, ক’টা লাগেজ আছে জানতে চাইলো। কাঁধের ঝোলাসহ চার লাগেজ বলতেই দূর থেকে লাগেজ দেখে হাসিমুখে বলে দিলেন, ” এভরিথিং ওকে, আপনি ওদিক দিয়ে চলে যান “।
টাকা চাওয়ার কোন লক্ষণ দেখলাম না, বুঝতেও পারছিলামনা আমার হাতে ধরা টাকা কাস্টমস অফিসারের হাতে গুঁজে দিতে হবে কিনা! কিন্তু অফিসারতো হাসিমুখে আমায় এভরিথিং ওকে বলে দিলেন। সেধে সেধে টাকা গুঁজে দিতে গিয়ে বিপদে পড়তে পারি ভয়ে হাতের টাকা নিজের পকেটে রেখে দিলাম। কেন জানি কাস্টমস অফিসারের ব্যবহারে আমার মনটা ভীষণ ভাল লাগলো।
এরপরের প্রতিটি স্টেপ খুব অবলীলায় পেরিয়ে গেছি।

এবার দেশে ফেরার পালা। ফেরার সময় গেদে সীমান্তে প্রচন্ড ভীড়ে দাঁড়িয়ে আছি, বেশ কিছুক্ষণ পর একজন অফিসার এগিয়ে এসে বললেন, ” আপনার সাথে আর কেউ এসেছে?”
– না, আমি একা”
-আপনি ভীড় থেকে সরে আসুন, আমি পাসপোর্ট করিয়ে দিচ্ছি।

অফিসার আমার পাসপোর্ট নিয়ে চলে গেলেন অন্য এক রুমে। সেখানে কাঁচের বিশাল টেবিলের ওপাশে আরেকটু বড় পদের অফিসার বসে আছেন, কম বড় অফিসারের কাছ থেকে আমার পাসপোর্ট নিয়ে সেই বড় অফিসার দেখে দিলেন।
কম বড় অফিসার পাসপোর্ট আমাকে ফিরিয়ে দিলেন, আমি আন্তরিকভাবে দুজনকেই ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতেই কম বড় অফিসার বললেন, ” অনেকক্ষণ ধরে আপনি এই ভীড়ে দাঁড়িয়েছিলেন, আমার খারাপ লাগছিলো, এজন্য আলাদা করিয়ে দিলাম। এবার আরামসে ট্রেনে গিয়ে উঠুন।

অফিসার আমার সাথে হেঁটেই বাইরে এলেন, আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। এই অফিসার কি চা খাওয়ার ইচ্ছে নিয়ে আমার পাসপোর্ট করে দিল!, নাকি উনি একজন সত্যিকারের ভালো মানুষ তাই আমায় হেল্প করলো। আমার এখন কি করা উচিত! আমার কাছে টাকা আছে, তিনি আমায় সত্যিই হেল্প করেছেন। এখন আমি যদি তাকে চা খাওয়ার পয়সা সাধি, সে মাইন্ড করবেনা তো? যদি চা খাওয়ার পয়সা না সাধি তাহলেও মাইন্ড করবেনা তো? ফাঁপরে পড়ে একটু আমতা আমতা করে বিনয়ের সাথে বললাম,
” আমি কি আপনাকে একটু চা খাওয়াতে পারি?
অফিসার জিভে কামড় কেটে হেসে বললেন, ” সবাইকে দিয়ে সব হয়না, সবার সাথে সব চলে না। আপনি একটুও ভাববেন না”।

অফিসারের কথাগুলো আমার দুই কানে একবার বিষের মত শোনাল, আরেকবার মধুর মত শোনাল। বিষের মত শুনিয়েছে কারণ চা খাওয়ার অফার দিয়ে আমি উনার ভালোমানুষীকে অপমান করেছি, সেটাই উনি বুঝে ফেলে আমায় উচিত জবাব দিয়ে দিয়েছেন।

আর মধুর মত শোনালো কারণ লোকমুখে শুনে শুনে ধারণা করে নিয়েছিলাম কাস্টমস অফিসার মানেই ‘ঘুষ’ খায়, এবং এটা ভাবতে আমার খারাপই লাগছিল, এবং আমিও যে ঘুষ দেয়ায় খুব বেশি পারদর্শি নই, তা হয়তো আমার প্রস্তাব দেয়ার ভঙ্গিতেই উনি বুঝে গেছিলেন। উনি এই কথাগুলো বলে উনাদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাটা ভেঙে দিতে চাইলেন।
কম বড় অফিসারের অনেক বেশি বড় ভদ্রতাবোধ, সততায় আমাকে মুগ্ধ হতেই হলো, বিনয়ী হতেই হলো। মাথা নীচু করে ধন্যবাদ জানালাম।

দেশে ফিরে চেনা বন্ধু, আত্মীয়স্বজনের কাছে যাওয়া আসার পথের বর্ণনা দিতে গিয়ে কাস্টমস অফিসারদের গল্পটাও বলেছি। অনেকেই আমার ‘আমেরিকান পাসপোর্টের’ কথা বলে বুঝাতে চেয়েছে, ওসব ভালোমানুষি টানুষি কিছুইনা , সব নাকি আমার হাতে ধরে থাকা আমেরিকান পাসপোর্টের কারিশমা।

শুনে তো আমি থ!বলে কি এরা! আমেরিকান পাসপোর্ট বহন করার মধ্যে আমি কোন বাড়তি ক্রেডিট খুঁজিনা, তাই পাসপোর্ট হাতে নিয়ে ঘুরিও না। সেদিনও দুবারই আমি সাধারণ মানুষের লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম, পাসপোর্ট আমার ব্যাগের মধ্যে ছিল, কেউই দেখেনি। আমেরিকান পাসপোর্ট দেখালে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়, এটাই জানতাম না। জানলে কি কাস্টমস অফিসারকে চা খাওয়ার পয়সা কিভাবে সাধবো তা ভেবে এত টেনশান করতাম!

আমিও সবাইকে বলেছি, সৎ এবং ভালো মানুষ আছে আমাদের আশে পাশে,—-যারা এটা বিশ্বাস করতে দ্বিধা করে, তাদের আত্মবিশ্বাস কম।
আমি তো বিশ্বাস করি, ভালো মানুষ চারদিকে প্রচুর আছে, সৎ মানুষ প্রচুর আছে, পরোপকারী মানুষ প্রচুর আছে। তাদের খোঁজ সবাই পায়না, আমি প্রায়ই তাঁদের দেখা পাই। তাই বার বার আমার বিশ্বাসই জয়ী হয়

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 126 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com