সড়কের সন্ত্রাস 

Print

সাদিকুর রহমান।
বর্তমানে বাংলাদেশে যে সব সমস্যা বড় আকারে রুপ নিয়েছে, তার মাঝে অন্যতম হলো সড়ক দুর্ঘটনা। এই সড়ক দুর্ঘটনা আসলে বর্তমানে ত্রাসে রুপ নিয়েছে। যার দরুণ চালকদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবন।
বর্তমানে সড়কে যাতায়াত এতটাই অনিরাপদ যে,বলা হয়ে থাকে একজন মানুষ বাহিরে বের হলে পুনরায় ঘরে ফিরতে পারবে এটা বলা অনিশ্চিত। সম্প্রতি এই দুর্ঘটনাটি মহামারী আকারে জন্ম নিয়েছে। যার কারনেই মূলত ফুসে উঠেছে কোমলমতী শিক্ষার্থীরা।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে প্রতিদিন ২০ জন করে মারা গেলেও ২৯ জুলাই কুর্মিটোলায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু সাড়া বাংলাদেশকে যেন নাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রত্যেকটি দুর্ঘটনায় চালক,গাড়ির ত্রুটি কিংবা পথচারীর অসতর্কতায় সংঘটিত হয়। কিন্তু দিয়া খানম মিম ও আব্দুল করিম রাজিবের মৃত্যুটি তাদের অসতর্কতা বা তাদের কোন ভুলের জন্য সংঘটিত হয় নি;বরং হয়েছে চালকের প্রতিযোগিতা মূলক স্বভাবের জন্য। আর তাই এটিকে বিশ্লেষকরা দুর্ঘটনা না বলে হত্যা বলেই সম্বোধন করেছেন। আর এই হত্যা বা দুর্ঘটনার পর যখন সরব হয়ে উঠেছিল তার ছোট্ট বন্ধুরা, তখন তাদের সাথে যোগ দেয় সারা বাংলাদেশের স্কুল কলেজ পড়ুয়া অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশুরাও।

অপ্রাপ্ত বয়স্ক তরুণদের এই আন্দোলন কে ফলাও ভাবে প্রচারও করেছে বিশ্বের বড় বড় সব মিডিয়া। আর এতে এটি প্রাসঙ্গিক ভাবে প্রমাণিত হল যে, এই অঞ্চলের মানুষের রক্তে আদি পুরুষের যে ছাপ রয়েছে তা সত্যিকার অর্থেই প্রশংসার যোগ্য।
২৯ জুলাইয়ের এই দুর্ঘটনার পরই উঠে এসেছে পেছনেকার যাবতীয় চিত্র। যা আমাদের কল্পনার রাজ্যে কেবল রক্ত আর রক্তই ভেসে উঠে। কেননা  ARI এর দেয়া ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সালের তথ্য মতে, ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা হয় অতিরিক্ত গতির কারনে। আর চালকদের মনোভাবের জন্য হয় ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ ৯৩ শতাংশ দুর্ঘটনা হচ্ছে এই দু’টি কারনে। সরকার যদি এই দু’টি  কারণ কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলেই কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে। বাকি থাকে আর ১০ শতাংশ। যা হয় কেবল গাড়ির ত্রুটি, পথচারীর বেপরোয়া মনোভাব, ফুটপাথ ব্যবহার না করা সহ ইত্যাদি কারনে। তবে এই কারণগুলো গৌণ হলেও দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যা কেবল রোধ করা যায় রাষ্ট্র যন্ত্র প্রয়োগ করেই।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির রিপোর্টটি দেখলে না আৎকে উঠে কোন উপায়  থাকে না। কেননা তাদের পরিসংখ্যান বলছে ২০১৫ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে ছয় হাজার পাঁচশত একত্রিশটি।দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গিয়েছে মোট আট হাজার ছয়শত বিয়াল্লিশ জন।আর আহত হয়ে পুংুত্ব  বা অসহনীয় জীবন যাপন করছে একুশ হাজার আটশত পঞ্চাশ জন।
২০১৬ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সারা দেশে দুর্ঘটনা হয়েছে মোট ৪ হাজার ৩১২ টি।আর দুর্ঘটনায় মারা যান ৬ হাজার ৫৫ জন।আহত হয়েছে ১৫ হাজার ৯ শত ১৪ জন।

২০১৭ সালের চিত্র আরো ভয়াবহ। উক্ত সালে দুর্ঘটনা হয়েছে মোট ৪ হাজার ৭ শত ৯৭ টি।প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৩ শত ৯৭ জন।আহত হয়েছে ১৬ হাজার ১ শত ৯৩ জন।আবার এর মাঝে পংু হয়েছে ১২ হাজার ৭ শত ২২ জন।
আর এই দুর্ঘটনাগুলোর মাঝে সবচেয়ে বেশি সংঘটিত হয় মোটরসাইকেলের দ্বারা। যার পরিমাণ প্রায় ৩৪ শতাংশ। আর ২৭.৫ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান। বাস ও মাইক্রোবাসের অবস্থান যথাক্রমে ২৫ ও ১৪ শতাংশে।

ARI এর পরিসংখ্যানে আরো দেখা যায় যে, দুর্ঘটনায় যারা নিহত হয় তাদের মাঝে ৫৪ শতাংশের বয়স ১৬ -৪০ এর মধ্যে। রয়েছে ১৮ শতাংশের মত শিশু, যাদের বয়স ১৫ বা এর নিচ।
ARI এর সর্বশেষ রিপোর্ট অনুসারে বাংলাদেশে ২০১৮ সালে জানুয়ারি থেকে জুলাই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি মাসে প্রাণ ঝরেছে ২৪ জন করে।মোট প্রাণ হারিয়েছে এভাবে ১৬৮ জন।যা আমাদের নিম্নমধ্যবিত্ত দেশের জিডিপিতে সরাসরি আঘাত হানছে। আর এ কারনে জিডিপির মোট অংশ থেকে কাটা পড়ছে ২ শতাংশ। এ ভাবে প্রতি বছরে নষ্ট হচ্ছে ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো প্রায়।

সড়ক দুর্ঘটনার এই ভয়াবহতায় আমাদের সামনে সাধারণত এটাই ভেসে উঠে যে,সরকার এ নিয়ে কি চিন্তা করছে। আর কি প্রতিকারই বা তারা নিতে যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞ মহলে এর প্রতিকারে সর্বত্রই যে কথাগুলো বলছেন তা হল-উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান, রাস্তাঘাট সংস্কারকরন,ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন বন্ধ করন,অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন রোধ করন, ট্রাফিক ও সিগন্যাল ব্যবস্থার উন্নয়ন।

সর্বোপরি এর প্রতিকারে আমাদের প্রত্যেকের একান্ত সহযোগিতাই সরকার কে আরো উদ্যোগী করে তুলবে। এমন আশাই আমরা সরকারের কাছে রাখতে পারি।

(সাদিকুর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,সাভার)

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 239 বার)


Print
bdsaradin24.com