হাজীদের সেবায় নিবেদিত প্রাণ ড. নাসের

Print

বাংলাদেশে হজ এজেন্সির জন্ম ২০০১ সালে। আর হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) এর প্রতিষ্ঠা হয় ২০০২ সালে। তারও আগে ১৯৯৭ সালে সরকারের অনুমোদনে হাজীদের কল্যাণে বাংলাদেশ হজযাত্রী ও হাজী কল্যাণ পরিষদ গড়ে তোলেন আলহাজ এডভোকেট ড. আব্দুল্লাহ আল নাসের। সেই থেকে আজ অবধি হাজীদের কল্যাণে কাজ করে আসছেন নিবেদিত এই প্রাণ। হজ নিয়ে দেশের নানা অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও সংকট নিরসনে করণীয় নিয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি মুখোমুখি হন তিনি।

আপনার ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই…

ড. আব্দুল্লাহ আল নাসের:প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে আমি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে কাজ শুরু করি। সেই থেকে আইন পেশাতেই আছি। যখন আমি প্রথমবার হজে গিয়েছিলাম তখন বাংলাদেশ থেকে হজে যাওয়া হাজীদের নানা দুর্ভোগ-দুর্দশা নিজ চোখে দেখেছিলাম। এরপর দেশের উচ্চ পর্যায়ের নীতি নির্ধারকদের সাথে নিয়ে হাজীদের কল্যাণে কাজ শুরু করি। আইন পেশার পাশাপাশি দীর্ঘ একুশ বছর ধরে হাজীদের কল্যাণেই কাজ করে আসছি।

পেশা হিসেবে আইন এবং আন্দোলন হিসেবে হজকে কেন বেছে নিলেন…

ড. আব্দুল্লাহ আল নাসের:ছেলেবেলা থেকেই আমি একজন ধর্মভীরু মানুষ। বৈষম্য এবং দুর্নীতি আমার ভীষণ অপছন্দের একটি বিষয়। বড় হয়ে আমি দেখেছি কিভাবে মানুষ আইনের মারপ্যাচে পড়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। আমরা উত্তরের মানুষেরা চিরকালই মানুষের ন্যায্য অধিকারের বিষয়ে সোচ্চার। এ কারণেই আমি আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছি।

একদিকে আমার পড়াশোনা আইন নিয়ে, অন্যদিকে ধর্ম নিয়ে আমার ব্যাপক আগ্রহ। আমাদের দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা হজ পালনের ক্ষেত্রে যেসব দুর্ভোগ দুর্দশায় পড়ে থাকেন সেই্সব সংকট নিরসনে আমি আইনের যুক্তি দিয়ে লড়ি, গড়ে তুলেছি সংগঠন। যতদিন বেঁচে থাকব আমি ন্যায়বিচারের পক্ষে ও হাজীদের কল্যাণে কাজ করব।

এবার সরকারি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় কতজন হজে যাবেনকতজনের হজ গমন অনিচ্ছিত….

ড. আব্দুল্লাহ আল নাসের: ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্যমতে, এ বছর (২০১৮) বাংলাদেশ থেকে হজে যাবেন ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন বাংলাদেশি।এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭ হাজার এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ১ লাখ ২০ হাজার ১৯৮জন হজে যেতে পারবেন।

আর হজ গমন অনিশ্চিতের বিষয়ে বলতে গেলে-গত বছর তিন দফায় সরকার হজ কোটা ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল, এবার ওই কোটা এখনও অবধি ৪ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। গত ২২ তারিখ পুনরায় ৪ শতাংশ বাড়িয়েছে । যদি এবার রিপ্লেসমেন্ট আর বাড়ানো না হয় তাহলে ৫ থেকে ৭ হাজার বাংলাদেশির হজ্জ পালনের স্বপ্ন পূরণ হবে না। এ কারণেই হজ এজেন্সিগুলো চার শতাংশের পরিবর্তে পূর্বের ন্যায় ১৫ শতাংশ রিপ্লেসমেন্টের দাবি করে আসছে। এজন্যই হজ এজেন্সিগুলোও হজে গমনেচ্ছুদের জন্য উড়োজাহাজের টিকিট সংগ্রহ করছে না। ফলে হজ ব্যবস্থাপনায় শেষ মুহূর্তে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছি।

হজের জন্য সরকার নির্ধারিত খরচ নিয়ে কিছু বলুন…..

ড. আব্দুল্লাহ আল নাসের:সরকারী ব্যবস্থাপনায় হজ ১ প্যাকেজ অনুযায়ী খরচ হবে ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৯২৯ টাকা। সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্যাকেজ ২–এ খরচ হবে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩৫৯ টাকা। এর মধ্যে বিমানভাড়া বাবদ খরচ হবে ১ লাখ ৩৮ হাজার ১৯১ টাকা ।

বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বিমানভাড়াসহ অন্যান্য সাধারণ খরচ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৭৭ টাকা। এর সঙ্গে হজ এজেন্সিগুলো অন্য সার্ভিস চার্জ মিলিয়ে বাকি খরচ নির্ধারণ করবে। সর্বনিম্ন মোট খরচ সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্যাকেজ ২–এর কম হতে পারবে না। অর্থাৎ বেসরকারি ব্যবস্থাপনারও সর্বনিম্ন খরচ ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩৫৯ টাকার কম হওয়া যাবে না।

এ ছাড়া সুবিধা অনুযায়ী হজে যাওয়ার টাকা নির্ধারণ হবে। কেউ যদি ভালো হোটেলে থাকে, তাহলে খরচ স্বাভাবিকভাবে বেশি হবে।

ধর্ম মন্ত্রণালয় বলছেএজেন্সিগুলো এ পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার হজযাত্রীর টিকিট সংগ্রহ করেনিএ বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব দুই দফায় ১৪৪ এজেন্সির মালিককে ডেকে দেন-দরবার করেছেতারপরও টিকিট সংগ্রহ করছে না হজ এজেন্সিগুলো। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন…..

ড. আব্দুল্লাহ আল নাসের:টিকিট সংগ্রহ না করার বিষয়টি মিথ্যে নয়। এ জন্য যথোপযুক্ত কারণও রয়েছে। লোকসান বাড়ার আশংকা থেকেই এজেন্সিগুলো টিকেট সংগ্রহ থেকে বিরত রয়েছে। রিপ্লেসমেন্টের জন্য এজেন্সিগুলো টিকিট করছেনা।

আরেকটি সঙ্গত কারণ হলো গত বৎসর বিমান ভাড়া ছিল ১ লক্ষ ২৪ হাজার টাকা, এবার বিমান ভাড়া ১ লক্ষ ৩৮ হাজার টাকা। মোয়াল্লেমের অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ গত বৎসর ছিল ৭২০ সৌদি রিয়্যাল এবং ১১ শত থেকে ১৫ শত সৌদি রিয়্যাল। মক্কা ও মদিনা শরীফে বাড়ি ভাড়া অত্যাধিক হারে বেড়েছে। তাই রিপ্লেসমেন্টকৃত হাজীদের বিমান ভাড়া ব্যাংকেও জমা রাখা আছে।

ইতোমধ্যে এজেন্সিগুলো মক্কা ও মদিনা শরীফে তাদের (এজেন্সির) মাধ্যমে যেসব হাজী সৌদি যেতে চায় তাদের জন্য হোটেল ভাড়া করেছে, মোয়াল্লেম এর অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ দিয়েছে, মোয়াল্লেম ফি জমা দিয়েছে।

এ বছর যদি রিপ্লেসমেন্ট গত বছরের চেয়ে কম দেয়া হয় তাহলে হজ্জ এজেন্টগুলোর লক্ষ লক্ষ টাকার ক্ষতি হবে।

তাছাড়া এবার ৫ হাজার হজ্জযাত্রীর কোটা পূরণ না হলে আগামী বছর সমসংখ্যক কোটা সৌদি সরকার বাংলাদেশকে নাও দিতে পারে। অথচ আমরা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি, রিপ্লেসমেন্ট এর সংখ্যা বাড়ালে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কোন ক্ষতি হবে না। বরঞ্চ রিপ্লেসমেন্ট দিয়ে পুরো কোটা পুরণ হলে সরকারের ভাবমূর্তি আরও বাড়বে।

আসলে হজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে তৈরিকৃত জাতীয় হজ ওমরাহ নীতিমালা যারা বানিয়েছে তারা নিজেরাই সেটা মানতে চাইছেন না। এ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নানা অনিয়ম চলে আসছে। এ কারণে ফাইনাল রেজিস্ট্রেশনে সরকারি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে বিশাল বৈষম্য। ফলে বিনা কারণেই মাশুল গুনছেন হজ পালনে ইচ্ছুক বাংলাদেশের অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মুসলমান।

এজেন্সিগুলো হজ গাইড নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেএ বিষয়ে আপনি…

ড. আব্দুল্লাহ আল নাসের:এটাতো উঠারই কথা। সরকারী খরচে কিছু লোকজনকে হজগাইড হিসেবে পাঠানো হলেও তাদের অনেককে সৌদি আরবে  গিয়ে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার নিজেদের কর্তব্য পালন না করে অর্থের বিনিময়ে বিদেশি হজযাত্রীদের সেবা দেন।

এদের অধিকাংশই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হওয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়না।

হজ নিয়ে সরকার ও এজেন্সিগুলো উভয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেএমন অভিযোগও উঠেছে…

ড. আব্দুল্লাহ আল নাসের:মানছি হাজীদের হজে পাঠানোটা এজেন্সি গুলোর ব্যবসা। কিন্তু ধর্মেরও কিছু দায়বদ্ধতা আছে, যেটি এজেন্সি গুলো মেনে থাকে। কিন্তু কিছু মোরাল এজেন্সিগুলো মানলেও সরকারী আমলারা সেসবের তোয়াক্কাও করেন না। অভিযোগ সুস্পষ্ট হলেও ব্যবস্থা নেয়ার কোনো দৃষ্টান্ত তারা এ যাবৎ স্থাপন করেনি।

হাজীদের জন্য অপেক্ষাকৃত কম সিটের বিমান দিয়ে প্রতিনিয়ত সরকারকে লোকসানে ফেলছেন বিমানের এমডি। আর ওই লোকসানের দায় নানা পারপাসে তিনি হজ্জযাত্রীদের উপর চাপিয়ে দিতে চান। এসব কারণে ইতোমধ্যে আমরা বিমান এমডির পদত্যাগও দাবি করেছি। কিন্তু চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী ।

হজ এজেন্সিগুলোকে তলব করে সতর্ক করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। জানিয়েছেএজেন্সির গাফিলতির কারণে কোনো হজযাত্রী হজে যেতে ব্যর্থ হলে তাদেরই এর দায় বহন করতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট হজ এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে……

ড. আব্দুল্লাহ আল নাসের:আমরা সবসময় হাজীদের কল্যাণে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হয়েছি। কোনো এজেন্সির তরফদারি করতে নয়। তাদের কাছে হজ নিয়ে নানা অনিয়ম ও অভিযোগ তুলে ধরেছি। সংকট নিরসনের জন্য যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যাও উপস্থাপন করেছি। কিন্তু এতসব কিছুর পরেও টনক নড়ছে না তাদের। আমরা এখন সচিব মহোদয়ের সু-সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।

আর যে দায়ের কথা মন্ত্রণালয় বলছে, সেটা যদি এজেন্সির হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে চাইলে সরকার যে কোনো সময়ই আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে। দেন দরবারের প্রয়োজন হয় কেন?

পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি পানির মতো পরিস্কার হয়ে যাবে। তারা আবদারও করবেন, ্আবার মিডিয়াতে ভয়ডর লাগানোর গল্প প্রচার করবেন, দুটো বিষয় একটির সাথে আরেকটি আসলেই যায়না।

বর্তমানে কোন কোন বিষয়ে সুনজর দিলে হজ ব্যবস্থাপনায় সংকট কাটবে বলে মনে করেন…

ড. আব্দুল্লাহ আল নাসের:রিপ্লেসমেন্ট বাড়ানো, প্লেন ফেয়ার কমানোসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে সুনজর দেয়া জরুরি। এ বিষয়ে সরকার গত বছরের চেয়েও কঠোরতা দেখাচ্ছে। সরকার হজে যেতে আগ্রহীদের মোট সংখ্যার মাত্র চার শতাংশ রিপ্লেসমেন্টের সুযোগ দিয়েছে। এটি খুবই সামান্য। মৃত্যু ও গুরুতর অসুস্থতা ছাড়াও অনেক হজযাত্রী রেজিস্ট্রেশন করেও হজে যেতে চান না। তাদের বিষয়ে রিপ্লেসমেন্টের সুযোগ পাচ্ছে না। এজন্য হজ এজেন্সিগুলো দাবি করেছে রিপ্লেসমেন্টের এ হার বাড়ানোর জন্য।

তবে হজযাত্রীরা হচ্ছেন আল্লাহর মেহমান। তাদের দেখভালের দায়িত্বটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদেরকে অবশ্যই বাংলাদেশ ও সৌদি সরকারের নিয়ম নীতি মেনে চলতে হবে।

আর একটি বিষয় আমি শুরু থেকেই বলে আসছি। সেটি হলো বিমানের ভাড়া নিয়ে। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় আড়াই গুন বেশি বিমানের ভাড়া দিয়ে হজ পালনে যাওয়া হাজীদের উপর নিজেদের দীনতার দায় চাপানোর মতো। এক্ষেত্রে নীতি নির্ধারকদের কাছে আমার অনুরোধ, ভাড়া কমিয়ে বাংলার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হজ পালনে যাওয়ার পথ সুগম করে দিন।

জুমবাংলা

 

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 236 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com