হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ : নতুন করে চেনা

Print

১৯৬৫ সালে এক অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীর রক্তে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়। অন্যদিকে হেপাটাটিস ‘সি’ ভাইরাস আবিষ্কৃত হয় ১৯৮৯ সালে।

বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৩৫ কোটি লোক হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত। আর অন্যদিকে পৃথিবীতে হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১৭ থেকে ২০ কোটি।রক্ত আর স্ত্রী সহবাসের মাধ্যমে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসটি ছড়ায়। অন্যদিকে হেপাটাইটিস ‘সি’ ছড়ায় মূলত রক্তের মাধ্যমে। হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তমাখা সুইয়ের খোঁচায় ভাইরাসটি সংক্রমণের আশঙ্কা ৩০ শতাংশ আর হেপাটাইটিস ‘সি’র ক্ষেত্রে তা ৩ শতাংশ। হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস আক্রান্ত মায়ের সন্তানের জন্মের পর পর আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৯০ শতাংশ। তবে মায়ের দুধের মাধ্যমে হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’ ভাইরাস ছড়ায় না। সামাজিক মেলামেশা যেমন—হ্যান্ডশেক বা কোলাকুলি এবং রোগীর ব্যবহার্য সামগ্রী, যেমন—গ্লাস, চশমা, তোয়ালে, জামা-কাপড় ইত্যাদির মাধ্যমেও এসব ভাইরাস ছড়ায় না।

বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে সংক্রমিত।

এদের মধ্যে প্রায় ৮০ লাখ থেকে এক কোটি লোক ক্রনিক হেপাটাইটিস ‘বি’তে আক্রান্ত। আর এ দেশে হেপাটইটিস ‘সি’ ভাইরাসে সংক্রমিত লোকের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। এসব আক্রান্ত রোগীর অনেকেই জীবনের কোনো এক পর্যায়ে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকিতে আছেন।পাশাপাশি হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ রোগীরা ভাইরাসের রিজার্ভার হিসেবে থেকে যান। তাঁদের কাছ থেকে যেকোনো সুস্থ লোকের এসব ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ নতুন করে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছেন। মহিলা, গর্ভবতী মা এবং নবজাতক শিশুদের বেলায় হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি।

আর সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো—এ দেশে প্রায় ২০ হাজার লোক প্রতিবছর হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসজনিত লিভার সিরোসিস অথবা লিভার ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন। প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী শুধু হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত এ দেশের ১০ শতাংশ লোকের চিকিৎসা ব্যয় বছরে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এককথায় হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় সমস্যা।

হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত প্রায় ৭০ শতাংশ রোগীর জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার কোনো ইতিহাস থাকে না। ১০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি আর প্রায় ৯০ শতাংশ শিশু, যারা ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তাঁদের লিভারে স্থায়ী ইনফেকশন দেখা দেয়। অন্যদিকে ৯০ শতাংশ ব্যক্তির লিভারে হেপাটাইটিস ‘সি’ ক্রনিক হেপাটাইটিস তৈরি করে। এ ধরনের রোগীদের প্রায়ই কোনো লক্ষণ থাকে না। এঁরা কখনো কখনো পেটের ডান পাশে ওপরের দিকে ব্যথা, দুর্বলতা কিংবা ক্ষুধামান্দ্যর কথা বলে থাকেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিদেশে যাওয়ার সময় রক্ত পরীক্ষা করতে গিয়ে কিংবা রক্ত দিতে অথবা ভ্যাকসিন নিতে গিয়ে রোগীরা তাঁদের হেপাটাইটিস ‘বি’ কিংবা ‘সি’ ইনফেকশনের কথা জানতে পারেন।

ক্রনিক হেপাটাইটিস ‘বি’ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আরো অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশেও লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ। আর ‘সি’র অবস্থান তার পরপরই। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ নিরাময়যোগ্য রোগ হলেও অ্যাডভান্সড লিভার সিরোসিস অথবা লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত রোগীরা প্রায়ই কোনো শারীরিক অসুবিধা অনুভব করেন না। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগ ধরা পড়ার পর হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস ইনফেকশনের চিকিৎসা করা সম্ভব হলেও রোগীকে আর সেভাবে সাহায্য করা সম্ভব হয় না।

বর্তমানে বিশ্ববাজারে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য কার্যকর ভ্যাকসিন রয়েছে। বাংলাদেশেও তৈরি হচ্ছে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের আন্তর্জাতিকমানের ভ্যাকসিন। অবশ্য ‘সি’ ভাইরাসের কোনো ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত মায়ের সন্তান, হেপাটাইটিস ‘বি’ রোগীর স্বামী বা স্ত্রী, স্বাস্থ্যকর্মী এবং থ্যালাসেমিয়া ও অন্যান্য হেমোলাইটিক এনিমিয়ার রোগীদের জন্য হেপাটাইটিস ‘বি’র ভ্যাকসিন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আর বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে হেপাটাইটিস ‘বি’ সংক্রমণের হার যথেষ্টই বেশি, সেখানে প্রত্যেক নাগরিকেরই উচিত হেপাটাইটিস ‘বি’র ভ্যাকসিন নিয়ে নেওয়া। তবে ভ্যাকসিনটি নিতে হবে কোনো ভালো জায়গা থেকে। কারণ ঠিকমতো সংরক্ষণ করা না হলে এই ভ্যাকসিন কোনো উপকারেই আসে না।

হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ আজ আর কোনো দুরারোগ্য ব্যাধি নয়। লিভারে সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ দেখা দেওয়ার আগে এটি ধরা গেলে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির নিরাময়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। পৃথিবীতে আজ এই দুটি ভাইরাসের জন্য বেশ কয়েকটি ওষুধ রয়েছে, যার সবই বাংলাদেশেও সহজলভ্য। সুসংবাদ এই যে আমাদের দেশীয় একাধিক ওষুধ কম্পানি এই ওষুধগুলো যে শুধু এ দেশে তৈরিই করছে তা নয়, বরং সেগুলো পৃথিবীর ১০০টিরও বেশি দেশে রপ্তানিও করছে।

পাশাপাশি এ দেশের গবেষকদের গবেষণার ফলাফললব্ধ হেপাটাইটিস ‘বি’র নতুন ওষুধ ‘ন্যাসভ্যাক’ হেপাটাইটিস ‘বি’ চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। ওষুধটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে, আর এর কার্যকারিতাও অনেক বেশি। বিশেষ করে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী লিভার রোগ নিয়ন্ত্রণে ন্যাসভ্যাক সবচেয়ে কার্যকর ওষুধ বলে প্রমাণিত হয়েছে। এরই মাঝে কিউবাসহ লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকার একাধিক দেশে ওষুধটি বাজারজাত হচ্ছে। জাপানে বর্তমানে ন্যাসভ্যাকের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ন্যাসভ্যাকের রেসিপি অনুমোদন করেছে। আশা করা যায়, শিগগিরই বাংলাদেশে ওষুধটির ব্যবহার শুরু হবে। ন্যাসভ্যাক হচ্ছে বাংলাদেশে ডেভেলপ করা প্রথম ওষুধ, যা বাংলাদেশে রেজিস্ট্রেশন পেয়েছে।

হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ আক্রান্ত রোগীদের জন্য আশাব্যঞ্জক অনেক কিছুই আছে। কিন্তু হতাশার জায়গাটা হচ্ছে এই যে এখন পর্যন্ত হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ আক্রান্ত ১০ শতাংশ মানুষও জানে না তারা এই ভাইরাসগুলোয় আক্রান্ত। এরই মধ্যে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলের অন্যতম গোল হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ নির্মূলের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আজ ২৮ জুলাই সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। এই দিবসটির মূল প্রতিপাদ্যই হচ্ছে এই রোগগুলো সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে ভাইরাস দুটিকে পৃথিবী থেকে পাকাপাকিভাবে বিদায় করা।

 

লেখক : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, ফোরাম ফর দি স্টাডি অব দ্য লিভার বাংলাদেশ

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 35 বার)


Print
bdsaradin24.com