‘৯৯৯’ নম্বরে ডায়াল করলেই মিলবে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশি সেবা

Print

এখন থেকে ‘৯৯৯’ নম্বরে ডায়াল করলেই মিলবে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশি সেবা। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের মতো আজ মঙ্গলবার (১২ ডিসেম্বর) থেকে বাংলাদেশেও চালু হচ্ছে জরুরি সেবা ‘৯৯৯’।

পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ বিভাগের এআইজি সহেলী ফেরদৌস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আপাত তিনটি জরুরি সেবা দেওয়া হবে এই ৯৯৯ সেন্টারের মাধ্যমে। পুলিশের সাহায্যের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দেওয়া হবে। যে কোনও মোবাইল ও ল্যান্ডফোন থেকে সম্পূর্ণ টোল-ফ্রি কল করে বাংলাদেশের যে কোনও প্রান্ত থেকে এই সেবা নেওয়া যাবে।’ পর্যায়ক্রমে এ সেবার পরিধি আরও বাড়ানো হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস ‘৯৯৯’ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণভাবে এ সার্ভিসের টেকনিক্যাল বিষয়গুলোর পরীক্ষা করা হয়েছে।’’ রাজধানীর আবদুল গনি রোডের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে এ সার্ভিসের দফতর খোলা হয়েছে বলেও জানা যায়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ শাখার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে পরিচালিত এ কল সেন্টারটিতে প্রথম বারের মতো বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবাগুলো থাকবে ৯৯৯ এ। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জরুরি সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১০০ কল-টেকার এজেন্ট, ১৯ জন ডিসপ্যাচার ও ৮ জন সুপারভাইজার দিয়ে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। দৈনিক তিন শিফটে ২৪ ঘণ্টায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

ইউসুফ আলী আরও জানান, জরুরি সেবা কার্যক্রমে একই সময়ে ১২০ জন সাহায্যপ্রার্থী কথা বলতে পারবেন। ৯৯৯ এ কল করতে কোনও টাকা খরচ হবে না। মোবাইল ফোনে টাকা না থাকলেও বিপদগ্রস্ত যেকোনও নাগরিক দেশের যেকোনও প্রান্ত থেকে ৯৯৯ এর মাধ্যমে পুলিশসহ অন্যান্য জরুরি সেবা সংস্থাগুলোর সাহায্য নিতে পারবেন। জরুরি সেবা ছাড়াও কোনও অপরাধ সংঘটিত হতে দেখলে, প্রাণনাশের আশঙ্কা দেখা দিলে, কোনও হতাহতের ঘটনা চোখে পড়লে, হতাহতের আশঙ্কা তৈরি হলে, আশেপাশে দুর্ঘটনা ও আগুনের ঘটনা ঘটলে ৯৯৯ এ কল দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

পুলিশ সদর দফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ৯৯৯ সার্ভিসের জন্য বিশাল তথ্য ভাণ্ডারের মোবাইল অ্যাপস ও ওয়েবসাইট রয়েছে, যা ব্যবহার করে জরুরি মুহুর্তে সহযোগিতা দেওয়া হবে। মোবাইল অ্যাপস বা ওয়েব সাইট ব্যবহার করে ৯৯৯ সার্ভিসের হেল্প ডেস্কে সরাসরি কথা বলা ছাড়াও প্রতিনিধির সঙ্গে লাইভ চ্যাট করা যাবে। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা অধিদফতর দ্বারা পরিচালিত কল সেন্টারগুলোতে সরাসরি কল করা যাবে। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন হাসপাতালের প্রয়োজনীয় ফোন নম্বর ও লোকেশন ম্যাপও রয়েছে এই অ্যাপস ও ওয়েব সাইটে। যে কেউ নিজের লোকেশনের তথ্য দিলে এই ফিচারটিতে নিকটবর্তী পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও লোকেশনের ম্যাপ প্রদর্শিত হবে।

পুলিশ সূত্রে আরও জানা যায়, তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ২০১৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে এ বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস- ৯৯৯’ পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালনা করা হয়েছে। ওই সময়ে নাগরিকদের পক্ষ থেকে সেবা নেওয়ার জন্য ৯৯৯ নম্বরে ২৭ লাখ ১০ হাজার ৭৬৪টি কল আসে। এর মধ্যে পুলিশের সহযোগিতা চেয়ে কল এসেছিল শতকরা ৬৪ দশমিক ৮ ভাগ। এরপরেই ছিল ফায়ার সার্ভিস ও আম্বুলেন্স সেবা নেওয়ার কল। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে গত ৮ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে এ সার্ভিসের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ সদর দফতরকে।

এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে দেশের ৬৪টি জেলায় প্রশাসনের সহায়তায় ৯৯৯ এর ব্যবহার, প্রচার ও কমিউনিটি সেফটি অ্যাওয়ারনেস কর্মশালা সম্পন্ন করা হয়। প্রত্যেকটি জেলা থেকেই ৯৯৯ এর কার্যক্রমকে অব্যাহত রাখা, এর প্রচারণা ও কার্যক্রম বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাজ্য, মালেয়েশিয়া, হংকং, পোলান্ড, আরব আমিরাত, বাহরাইন, কেনিয়া, কাতার, আয়ারল্যান্ড, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড ও জিম্বাবুয়েসহ অনেক দেশেই ৯৯৯ শটকোর্ডে জরুরি সেবা সার্ভিস চালু রয়েছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়াতে ‘০০০’, নিউজিল্যান্ডে ‘১১১’, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ‘১১২’, কানাডা ও আমেরিকায় ‘৯১১’ শটকোড দিয়ে জরুরি সেবা সার্ভিস চালু রয়েছে বলেও জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

ন্যাশনাল হেল্পলাইন নম্বর
ন্যাশনাল হেল্পলাইন নম্বর

ন্যাশনাল হেল্প-ডেস্ক- এর ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিলে প্রশ্ন শোনা যায়, “কিভাবে সহযোগিতা করতে পারি?”

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে একবছর ধরে এই জরুরি হেল্পলাইন নম্বরটি পরীক্ষামূলক ভাবে চালানোর পর গত ১২ই ডিসেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। কিভাবে কাজ করছে এই ন্যাশনাল হেল্প-ডেস্ক?

তা দেখতে গিয়েছিলাম জাতীয় জরুরি সেবার কল সেন্টারে।

বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করা হলে প্রশিক্ষিত এজেন্টরা জরুরি ফায়ার সার্ভিস বা পুলিশ কিংবা এ্যাম্বুলেন্স সেবা প্রদানকারীর সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেন।

এখানে যারা কল রিসিভ করেন তাদেরকে বলা হয় কল টেকার। তাদের তত্বাবধানের দায়িত্বে আছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা এখানে চারটি শিফটে কাজ করেন দু’শোর বেশি কর্মী।

এরকম একজন নারী কর্মীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কতগুলো কল রিসিভ করেছেন তিনি? সকাল থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত তিনি কল রিসিভ করেন ১৯৩টি।

কি ধরনের কল আসছে? এর উত্তরে এই কল টেকার জানান, মূলত পুলিশি সেবার চাহিদা থাকে বেশি।

৯৯৯
এপর্যন্ত তারা প্রায় পাঁচ লাখের মতো কল পেয়েছেন, যার মধ্যে ১৫ শতাংশের মত কলের সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “কোনও সহায়তা চাইলে আমরা লোকেশন সার্চ দেবো, তারপর সবচেয়ে কাছে যে থানা সেটার খবর জানাবো, আবার অ্যাম্বুলেন্স চাইলে নিকটস্থ সার্ভিসের খবর দেবো। আগুন লাগলে কোথাও সবচেয়ে কাছের ফায়ার স্টেশনের খবর জানাবো”।

কথা বলতে বলতেই তার কাছে আরেকটি ফোন কল চলে আসে।

আরেকজন পুরুষ কর্মী জানান, যেসব কল আসে তার মধ্যে অনেক উটকো কলও থাকে। আবার কেউ কেউ মোবাইল কোম্পানির কল-সেন্টার মনে করে বিভিন্ন প্রশ্ন করে। আসে বাচ্চাদের ফোনও।

তার ভাষায়, “রাতের বেলা যেসব কল আসে সেগুলো প্রধানত দুর্ঘটনা, অগ্নিকান্ড, ছিনতাই – এ ধরনের ‘জেনুইন’ কল।”

জরুরি সেবা-দানের কাজটি কিভাবে সম্পাদন করা হয় সে সম্পর্কে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন জাতীয় জরুরি সেবা বিভাগের পুলিশ সুপার মোঃ তবারক উল্লাহ।

তিনি জানান, কেউ ফোন করলে যত দ্রুত সম্ভব সার্ভিস দেয়ার চেষ্টা করেন। সেজন্য তারা কলারকে কনফারেন্সের মাধ্যমে অন্যান্য বিভাগের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেন”।

কিন্তু এই সেবা প্রদানের উপযুক্ত অবকাঠামো কতটা আছে তাদের?

বর্তমানে একইসঙ্গে ৩৩টি সংযোগের মাধ্যমে কল নেয়া হচ্ছে। সামনে ১০০টি কল সংযোগ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলছেন কর্মকর্তারা।

তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই নম্বরটি মোটামুটি পরিচিত হলেও নির্দিষ্টভাবে কি ধরনের সেবার জন্য এখানে ফোন করা যাবে তা জানেন না এখনো অনেকে।

ফলে মোবাইল সিম বিষয়ে তথ্য জানতে চেয়ে কিংবা ডাক্তারি নানা পরামর্শের জন্য ফোনকলও আসছে অহরহ।

তবে সত্যিই যারা জরুরি সেবা চাইতে ফোন করছেন – তারা কি বলছেন?

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তৌহিদুল আলম বলেন, তার এক বন্ধুর আত্মীয়র অসুস্থ হলে অ্যাম্বুলেন্স এর জন্য ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়েছিলেন। বাসার ঠিকানা দেয়ার পর ৪০/৫০ মিনিটের মধ্যে সেবা পেয়েছেন।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দ্রুত সেবা পৌঁছে দেয়া আর এক্ষেত্রে ঢাকা শহরে যানজটকে বড় একটি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যেমনটা বলছিলেন জাতীয় জরুরি সেবা বিভাগের এসপি মি: তবারকউল্লাহ। “বিশেষ করে ঢাকা শহরে প্রচণ্ড যানজটের কারণে প্লেস অব অকারেন্স-এ পুলিশ অথবা ফায়ার সার্ভিস যেতে কষ্ট হয়। এটা আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ”।

কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন গত ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে এই হেল্প-ডেস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৪ লাখ ৭৫ হাজারের ওপরে ফোন কল এসেছে, যার মধ্যে ৬০ হাজারের মতো কলের সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ১৫ শতাংশ সেবা প্রার্থীকে সেবা প্রদান সম্ভব হয়েছে এই হেল্পডেস্কের মাধ্যমে।

এর মধ্যে পুলিশি সেবার আবেদন ছিল সবচেয়ে বেশি ৫৫ শতাংশ।

এরপরেই ছিল ফায়ার সার্ভিসের জন্য ২৯% ফোনকল এবং তারপরে আছে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস এর জন্য ফোন। যার জন্য গড়ে ১৬ শতাংশ সেবাগ্রহীতা ফোন করেছেন।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin24@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 167 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ
bdsaradin24.com