অবুঝ রায়হানের পা কেটে বানানো হয় ‘ভিক্ষার মেশিন’

প্রিন্ট
অবুঝ রায়হানের পা কেটে বানানো হয় ‘ভিক্ষার মেশিন’
অডিও নিউজ
স্বয়ংক্রিয় পাঠ—ডিভাইসের সেরা উপলভ্য ভয়েস ব্যবহার করবে।
00:00 00:00
অডিও প্রস্তুত।

পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার দীর্ঘ সাত মাস পর ১২ বছরের কিশোর মোহাম্মদ রায়হান যখন ফিরে আসে, তখন তার শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছিল বিভীষিকাময় এক অভিজ্ঞতার ক্ষত। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি এলাকায় সিরাত মাহফিলের পাশে এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয়রা তাকে দেখতে পান এবং তার পরিবারকে খবর দেন। পরে তার বাবা নাজিম উদ্দীন সেখানে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন। সুস্থ-সবল একটি শিশুকে এভাবে এক পা হারানো অবস্থায় ফিরে পেয়ে পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। নোয়াগ্রামের দিনমজুর পরিবারের এই সন্তান স্থানীয় একটি হিফজখানার ছাত্র ছিল এবং চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে চুল কাটার কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে প্রথমে কক্সবাজার চলে যায় এবং সেখানে কিছু দিন কাটিয়ে এক ব্যক্তির প্রলোভনে ঢাকায় এসে পড়ে।

ঢাকায় আসার পর রায়হানকে কমলাপুর রেলস্টেশনের কাছে গাছপালা ঘেরা একটি অন্ধকার টিনের ঘরে বন্দি করে রাখা হতো বলে অভিযোগ উঠেছে। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ওই আস্তানায় তার মতো আরও অনেক শিশু বন্দি ছিল যাদের অনেকের হাত কিংবা পা কাটা ছিল। সালমা নামের এক নারীসহ কয়েকজন ওই শিশুদের দেখভাল করতেন এবং সকালে তাদের বিভিন্ন কাজে পাঠিয়ে দিতেন। শুরুতে রায়হানকে দিয়ে কমলাপুর এলাকায় পানি ও শরবত বিক্রি করানো হতো। কিন্তু পানি বিক্রি করে আশানুরূপ আয় না হওয়ায় ওই সংঘবদ্ধ চক্রটি তাকে স্থায়ীভাবে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানোর ফন্দি আঁটে। এরপর একদিন তাকে খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অচেতন করে ফেলা হয় এবং সকালে ঘুম ভাঙার পর সে দেখতে পায় তার ডান পা কেটে ফেলা হয়েছে।

পা হারানোর পর চক্রের সদস্যরা তাকে ট্রেন দুর্ঘটনায় পা হারানোর কথা বলতে শিখিয়ে দেয় এবং একটি হুইলচেয়ার দিয়ে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে ভিক্ষা করাতো। সুস্থ অবস্থায় সে দিনে যেখানে ছয়শ থেকে এক হাজার টাকা আয় করতো, পা হারানোর পর হুইলচেয়ারে বসিয়ে ভিক্ষা করিয়ে দিনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা হাতিয়ে নিতো ওই চক্রটি। সম্প্রতি চক্রের এক সদস্য তাকে কিছু টাকা দিয়ে বাড়ি চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলে সে বাসে চড়ে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় পৌঁছায়। এদিকে ছেলের পেটে কাটা দাগ দেখে কিডনি বা অন্য কোনো অঙ্গহানি ঘটেছে কি না, তা জানতে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে পরীক্ষা করানো হয়। চিকিৎসকরা জানান যে তার কিডনি অক্ষত রয়েছে, তবে তার শরীরে অমানবিক নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন রয়ে গেছে।

এই লোমহর্ষক ঘটনার পর শিশুটির পরিবার এবং স্থানীয় এলাকাবাসী একটি শক্তিশালী মানবপাচার ও অঙ্গহানি চক্রের সক্রিয় উপস্থিতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে এই চক্রের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে কঠোর আইনি শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি শিশুটির সঠিক চিকিৎসা এবং ভবিষ্যৎ পুনর্বাসনের জন্য সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছেন। লোহাগাড়া থানার পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির মূল আস্তানা যেহেতু ঢাকায় অবস্থিত, তাই ভুক্তভোগী পরিবারকে সংশ্লিষ্ট মতিঝিল থানায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভিযোগগুলোর সত্যতা মিললে এটি মানবপাচার, অপহরণ ও গুরুতর শিশু নির্যাতনের এক নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে প্রমাণিত হবে।

Facebook Comments Box

অটো ফটো কার্ড

একটি পেশাদার standard social-news card।

1080 × 1080 px
ফটো কার্ড এখনো তৈরি হয়নি দেওয়া sample-এর মতো square HD card তৈরি হবে।
অটো ফটো কার্ড
নিচের বিজ্ঞাপন ব্যানার সাইটের বর্তমান horizontal banner স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহার হবে।

এ জাতীয় আরও খবর

ভিডিও গ্যালারি প্রিন্ট