ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট লীলা নাগ

প্রিন্ট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট লীলা নাগ
অডিও নিউজ
স্বয়ংক্রিয় পাঠ—ডিভাইসের সেরা উপলভ্য ভয়েস ব্যবহার করবে।
00:00 00:00
অডিও প্রস্তুত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট লীলা নাগ: যে পথ খুলে দিয়েছিলেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯২১ সালে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নবগঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। আর নারী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল আরও বিরল। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিতে নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে নারী শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও পড়াশোনার পথ ছিল নানা প্রতিবন্ধকতায় ভরা।

এমন এক সময়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় কড়া নাড়েন লীলা নাগ।

কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক পাস করে পদ্মাবতী স্বর্ণপদক অর্জন করা লীলা নাগ ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়ার জন্য আবেদন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য স্যার পি. জে. হার্টগ শেষ পর্যন্ত তাঁর আবেদন অনুমোদন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইতিহাসে লীলা নাগকে ১৯২১ সালে ভর্তি হওয়া এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষাবর্ষে নারী শিক্ষার্থী ছিলেন শুধু লীলা নাগ নন। একই সময়ে সুষমা সেনগুপ্তও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। গবেষণাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯২১ সালের প্রথম শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র দুজন—লীলা নাগ ও সুষমা সেনগুপ্ত। লীলা ইংরেজিতে এবং সুষমা অর্থনীতিতে পড়াশোনা শুরু করেন।

শুধু ভর্তি নয়, ছিল নানা প্রতিবন্ধকতা

নারীদের জন্য তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা আবাসিক ব্যবস্থা তো ছিলই না, এমনকি পড়াশোনার পরিবেশ তৈরিতেও ছিল নানা সীমাবদ্ধতা। লীলা নাগের ক্লাস করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।

অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীর প্রবেশাধিকার নীতিগতভাবে স্বীকৃত হলেও বাস্তবে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ ছিল বেশ কঠিন।

শেষ পর্যন্ত সেই বাধা পেরিয়ে ১৯২৩ সালে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন লীলা নাগ। এর মধ্য দিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট হিসেবে স্থান করে নেন।

নিজের পথ খুলে অন্যদের জন্যও দরজা তৈরি

লীলা নাগের কৃতিত্ব শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উচ্চশিক্ষার দরজা নিজের জন্য খুলে নেওয়ার পর তিনি নারীশিক্ষাকে জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিচিতিতেও তাঁকে মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে কাজ করা একজন সমাজকর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকায় মেয়েদের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে লীলা নাগ কাজ করেন এবং একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে তিনি নারী আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন।

এক নারীর পথচলা, বহু নারীর ভবিষ্যৎ

লীলা নাগের জীবনকে তাই কেবল ‘প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট’ হওয়ার গল্প হিসেবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

তাঁর জীবনের গল্পটি যেন দুটি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথম অধ্যায়ে তিনি নিজেই এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা পেরিয়েছিলেন, যেখানে নারী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল ব্যতিক্রম। আর দ্বিতীয় অধ্যায়ে নিজের অর্জিত সুযোগকে নিজের মধ্যে আটকে না রেখে আরও বহু মেয়ের জন্য শিক্ষার পথ তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন।

আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, প্রশাসন ও নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক নারীর উপস্থিতি। নারী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা এখন আর বিস্ময়ের বিষয় নয়।

কিন্তু এক শতাব্দী আগে সেই পথটি এতটা সহজ ছিল না। সেই দীর্ঘ পথের একেবারে শুরুর দিকে দাঁড়িয়ে থাকা সাহসী নারীদের একজন ছিলেন লীলা নাগ।

তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো শুধু ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট’ হওয়া নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল—তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, একটি বন্ধ দরজায় প্রথমবার কড়া নাড়ার সাহস কখনো কখনো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পুরো পথটাই খুলে দিতে পারে।

© সোহেল রানা

Facebook Comments Box

অটো ফটো কার্ড

একটি পেশাদার standard social-news card।

1080 × 1080 px
ফটো কার্ড এখনো তৈরি হয়নি দেওয়া sample-এর মতো square HD card তৈরি হবে।
অটো ফটো কার্ড
নিচের বিজ্ঞাপন ব্যানার সাইটের বর্তমান horizontal banner স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহার হবে।

এ জাতীয় আরও খবর

ভিডিও গ্যালারি প্রিন্ট