পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ব্রিকস ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান

প্রিন্ট
পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ব্রিকস ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান
অডিও নিউজ
স্বয়ংক্রিয় পাঠ—ডিভাইসের সেরা উপলভ্য ভয়েস ব্যবহার করবে।
00:00 00:00
অডিও প্রস্তুত।

বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতার মানচিত্র এখন আর স্থির নেই। অর্থনৈতিক শক্তি অর্জনের সাথে সাথে উদীয়মান রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে উঠে আসছে। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের একটি বড় প্রতিফলন হলো ব্রিকসের উত্থান। এটি কেবল কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির জোট নয়, বরং বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা ও প্রতিনিধিত্বের অসম বণ্টনের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন।

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার নামের আদ্যক্ষর নিয়ে গঠিত ব্রিকস এখন অনেক বিস্তৃত। বর্তমানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া—এই ১১টি দেশ এর সদস্য। এছাড়া আরও বেশ কিছু রাষ্ট্রকে অংশীদার দেশের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্রিকস এখন বৃহত্তর দক্ষিণের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছিল, যখন বর্তমানের অনেক উদীয়মান শক্তির সক্ষমতা ছিল সীমিত। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির ভরকেন্দ্র এখন পরিবর্তিত। চীন ও ভারত বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে; ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ব্রিকস মূলত আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে বিদ্যমান অসামঞ্জস্য দূর করে বিশ্ব ব্যবস্থাকে অধিকতর বহুকেন্দ্রিক ও উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতি সংবেদনশীল করতে চায়।

ব্রিকসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন হলো ‘নতুন উন্নয়ন ব্যাংক’। এটি অবকাঠামো, জ্বালানি, পানি, নগরায়ণ ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করে। বাংলাদেশ ২০২১ সাল থেকেই এই ব্যাংকের সদস্য। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের জন্য ব্যাংকটির অনুমোদিত অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ৪৫ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এটি প্রমাণ করে যে, ব্রিকসের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং এর একটি কার্যকর আর্থিক ভিত্তি রয়েছে।

অনেকে ব্রিকসকে আঞ্চলিক সংস্থা বা পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে দেখার চেষ্টা করেন, যা কিছুটা অতিসরলীকরণ। ব্রিকস কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সদস্যরা এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকা থেকে এসেছে। ভারত বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো ব্রিকসের সদস্য হওয়ার পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের সাথেও গভীর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তাই ব্রিকসের প্রকৃত তাৎপর্য পশ্চিমকে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিকল্প দর-কষাকষির ক্ষেত্র তৈরি করা।

বাংলাদেশের জন্য ব্রিকসের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশকে বৈদেশিক অর্থায়ন ও নতুন বাজারের সন্ধানে থাকতে হবে। ব্রিকস সেই পরিবর্তনপর্বে একটি অতিরিক্ত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবলম্বন হতে পারে। এছাড়া এটি বাংলাদেশের ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতিকে আরও কার্যকর বহুমুখিতা দিতে সক্ষম।

তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা। দেশটির রপ্তানি ও উন্নয়ন সহযোগিতার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা। অন্যদিকে চীন, ভারত, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। ব্রিকসে যোগদানকে যদি কোনো পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়া হিসেবে দেখা হয়, তবে অপ্রয়োজনীয় কূটনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।

ব্রিকসের অভ্যন্তরেও কিছু জটিলতা রয়েছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ সব ক্ষেত্রে অভিন্ন নয়; চীন-ভারত প্রতিযোগিতা কিংবা রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধ এর উদাহরণ। এছাড়া সদস্যপদ মানেই স্বয়ংক্রিয় অর্থনৈতিক সাফল্য নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল, দক্ষ অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং প্রকল্প প্রস্তুতির সক্ষমতা।

পরিশেষে, ব্রিকসে প্রবেশের লক্ষ্য কেবল নতুন পরিচয় অর্জন হওয়া উচিত নয়। বরং অবকাঠামো অর্থায়ন, জ্বালানিনিরাপত্তা, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ অর্জনই মুখ্য হওয়া উচিত। আজকের বিশ্বে কোনো একটি শিবিরে আবদ্ধ না হয়ে নিজের অবস্থানের মূল্য বৃদ্ধি করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। ঢাকা যদি বেইজিং, দিল্লি, ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারে, তবেই তা হবে প্রকৃত কূটনৈতিক সাফল্য। ব্রিকসকে গন্তব্য নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ অর্জনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাই বাংলাদেশের জন্য সঠিক পথ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরবর্তী সময়ে এর পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভারতে ব্রিকস সম্মেলন: বিশ্বনেতাদের মধ্যে কেন চাপা দুশ্চিন্তা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রিকস মূলত এই অসামঞ্জস্যের জায়গাটিতেই প্রবেশ করেছে। চাকরির আরও তথ্য: আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও উন্নয়ন কাঠামোতে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর কণ্ঠ শক্তিশালী করা, অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়নে অর্থায়ন বৃদ্ধি, সদস্যদের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সংকটে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা—এসবই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রিকস কি অন্য আঞ্চলিক সংস্থার জন্য হুমকি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রিকস কি পশ্চিমের মোড়লগিরি ঠেকাতে পারবে।

Facebook Comments Box

অটো ফটো কার্ড

একটি পেশাদার standard social-news card।

1080 × 1080 px
ফটো কার্ড এখনো তৈরি হয়নি দেওয়া sample-এর মতো square HD card তৈরি হবে।
অটো ফটো কার্ড
নিচের বিজ্ঞাপন ব্যানার সাইটের বর্তমান horizontal banner স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহার হবে।

এ জাতীয় আরও খবর

ভিডিও গ্যালারি প্রিন্ট