ব্রেক্সিটের এক দশক পর বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে ব্রিটেনের নিজস্ব নীতিবোধ ও নেতৃত্বের দৃঢ়তা বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন ও সার্বভৌম দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের লক্ষ্য অর্জনে কেবল মৌখিক সমর্থন যথেষ্ট নয়, বরং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলবিরোধী তকমা পাওয়ার আশঙ্কায় ব্রিটেন যে দ্বিধায় ছিল, তা কাটিয়ে এখন সুনির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ কোনোভাবেই ইসরায়েলের সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং বর্তমান সরকারের অন্যায্য ও অযৌক্তিক নীতির বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ।
গাজার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ববিবেকের জন্য এক চরম পরীক্ষার নামান্তর। সেখানে চলমান ধ্বংসলীলায় ইতিমধ্যে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ২০ হাজারই শিশু। লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এবং পুরো গাজার জনসংখ্যাকে তাদের ভূখণ্ডের মাত্র এক-তৃতীয়াংশে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। এই মানবিক বিপর্যয় ও ভোগান্তি নিরসনে ব্রিটেন আর নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারে না।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে পূর্ববর্তী সরকারের পদক্ষেপগুলো ধীরগতির ছিল বলে মনে করেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছিলেন। বিশেষ করে ইসরায়েলি সরকারের অবৈধ বসতি স্থাপনের আগ্রাসী নীতি শান্তি প্রক্রিয়াকে হুমকির মুখে ফেলেছে। গত ২০ বছরে যে পরিমাণ অবৈধ বসতি স্থাপন করা হয়েছিল, বর্তমান ইসরায়েল সরকারের মাত্র চার বছরের শাসনামলেই তার চেয়ে বেশি বসতির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, চলতি বছরই ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করতে দেড় হাজারের বেশি বসতি স্থাপনকারী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ইসরায়েল সরকার ১০৪টি নতুন অবৈধ বসতির অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে আগামী অক্টোবরের নির্বাচনের আগে ‘ই-ওয়ান’ প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়বে এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা ধূলিসাৎ হবে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য সরকার তিনটি বড় ধরনের পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। প্রথমত, ফিলিস্তিনের দখলকৃত জায়গায় স্থাপিত অবৈধ বসতির সঙ্গে সব ধরনের পণ্য বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) রায়ের সঙ্গে সংগতি রেখে ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করছে যে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি দখলদারত্ব সম্পূর্ণ বেআইনি। তৃতীয়ত, অবৈধ বসতি স্থাপনে সহায়তা, সুবিধা প্রদান বা লাভবান হওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। এর আওতায় ‘ই-ওয়ান’ প্রকল্পের নির্মাণকাজে জড়িত সব ব্যবসা ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম পুনর্ব্যক্ত করেন যে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের চালানো সন্ত্রাসী হামলার তিনি তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন এবং এখনো জানান। তবে সেই ঘটনার অজুহাতে গাজা বা পশ্চিম তীরে ইসরায়েল সরকারের কর্মকাণ্ড সমর্থনযোগ্য নয়। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো ইসরায়েলের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নয়, কারণ তাদের অনেকেই নিজেদের সরকারের নীতির বিরোধী। এছাড়া, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের কর্মকাণ্ডের জন্য যুক্তরাজ্যের ইহুদি সম্প্রদায়কে দায়ী করা সম্পূর্ণ অন্যায় এবং এটি ইহুদিবিদ্বেষের শামিল। সরকার ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সমাজে ইহুদিবিদ্বেষ নির্মূলে বদ্ধপরিকর।
পরিশেষে, এই কঠোর পদক্ষেপগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মানুষ যাতে পাশাপাশি দুটি স্বাধীন ও নিরাপদ রাষ্ট্রে শান্তিতে বসবাস করতে পারে, সেই একমাত্র পথটিকে টিকিয়ে রাখা। গাজার মানুষের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা পাঠানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে শান্তির এই আশাকে বাঁচিয়ে রাখাই এখন ব্রিটেনের প্রধান লক্ষ্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংকট আর আশঙ্কায় ঘেরা এই কঠিন বিশ্বে ব্রেক্সিটের এক দশক পর এসে ব্রিটেনের নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাস ও নিজস্ব নীতিবোধে অটল থাকার শক্তি হারানোর একটা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রিটেন কোনো একটি সুনির্দিষ্ট নীতির পক্ষে শক্ত হয়ে দাঁড়াবে—এই মুহূর্তে সেটি যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু উপযুক্ত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এসব কথা যে একেবারে অর্থহীন, তা আমাদের অনুধাবন করতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু আজ অত্যন্ত ভেবেচিন্তে ও লক্ষ্যভিত্তিক কিছু পদক্ষেপের ঘোষণা দিচ্ছি আমরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফিলিস্তিনের জনগণের এই অবর্ণনীয় কষ্ট বিশ্বের বিবেককে নাড়া দেয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গাজায় নিষ্পাপ শিশুসহ অগণিত সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর পাশাপাশি সেখানে চরম মানবিক সংকট চলছে, প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে নামমাত্র। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গাজা যে কারণে একুশ শতকের প্রাণঘাতী যুদ্ধ।
সূত্র: প্রথম আলো
