‘জয়পাড়া লুঙ্গী’ লেবেলে বিক্রি হচ্ছে নিম্মমানের লুঙ্গী

Print
ইমরান হোসেন সুজন, আসিফ শেখ ও আলীনূর ইসলাম মিশু: 
দোহারের হাতে বুনানো তাঁতের লুঙ্গী শুধু দেশে নয় বিদেশেও সমাদৃত যা ‘জয়পাড়ার লুঙ্গী’ নামে পরিচিত। এ সুনাম কাজে লাগিয়ে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ থেকে পাওয়ার লোম ফ্যাক্টরীতে তৈরি অপেক্ষাকৃত নি¤œমানের লুঙ্গী ‘জয়পাড়া লুঙ্গী’ লেবেলে বিক্রি করে অল্পদিনেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন দোহারের উত্তর জয়পাড়া চৌধুরীপাড়া গ্রামের আব্দুর রহমান। এতে দোহারের হস্তচালিত তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত প্রান্তিক তাঁতীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ইতোমধ্যে দোহারের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প ধ্বংসের দারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। তাঁতীদের এই দুরবস্থার জন্য অন্যতম দায়ী এ জাতীয় অসাধু ব্যবসায়ীরা।
পাওয়ার লোম ফ্যাক্টরীতে তৈরি লুঙ্গীকে ‘হাতে বুনানো তাঁতের লুঙ্গী’ উল্লেখ করে কৌশলে ‘জয়পাড়া লুঙ্গী’ নামে বাজারজাতকরণের একাধিক অভিযোগ পেয়ে  অনুসন্ধানী টিম গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সরেজমিনে উপস্থিত হয় আব্দুর রহমানের বাড়িতে। সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা বেষ্টিত বাড়ির প্রবেশমুখেই নিরাপত্তা কর্মীর জেরার মুখে পড়ে অনুসন্ধানী দল। চারতলা ভবনের ভেতরের পুরো চিত্র দেখার আগ্রহ থেকে তাৎক্ষনিকভাবে কৌশল পাল্টাতে হয় দলটিকে। তারপরেও বিষয়টি সহজ হয়ে উঠেনা। আব্দুর রহমানের অবস্থানের কথা জানতে চাইলে বাড়ির নিরাপত্তা রক্ষী জানান, তিনি ভবনটির অফিস কক্ষে আছেন। তখন পাশ থেকে আব্দুর রহমানের স্ত্রী এসে কথা বলেন অনুসন্ধানী দলের সাথে। তার কাছে রহমান সাহেবের অবস্থানের কথা জানতে চাইলে তিনি জানান, সে ব্যাংকে আছেন। তখন অনুসন্ধানী দলে থাকা প্রতিবেদকরা বলেন, এইমাত্র আপনাদের নিরাপত্তা রক্ষী বললেন, রহমান সাহেব ভেতরে আছেন, আর আপনি বলছেন নেই।’ প্রতিবেদকদের এমন কথা শুনে নিরাপত্তা রক্ষীর উপর কিছুটা চটে যান রহমানের স্ত্রী। পরে অনুসন্ধানী দল কৌশল কাজে লাগিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।
চারতলা বিশিষ্ট বাড়িটির নিচতলায় ঢুকতেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস কক্ষে সাক্ষাত হয় কাঙ্খিত আব্দুর রহমানের সাথে এবং কৌশলে তাঁর কাছ থেকে পুরো বাড়ি ঘুরে দেখার অনুমতি লাভ করতে সক্ষম হয় প্রিয় বাংলার তিন সদস্য বিশিষ্ট অনুসন্ধানী টিম।
বাড়িটির নিচ তলায় দেখা যায়,  পাওয়ার লোম ফ্যাক্টরীতে তৈরি লুঙ্গীর (রুল আকারে) স্তুপ। দ্বিতীয় তলায় রুল থেকে কাটিং হয়ে লুঙ্গী চলে যাচ্ছে চতুর্থ তলায়, সেখান থেকে সেলাই হয়ে তা চলে আসছে ভাঁজের জন্য তৃতীয় তরায়। তৃতীয় তলায় ভাঁজ শেষে লুঙ্গীগুলো পুনরায় চলে আসছে দ্বিতীয় তলায়, সেখানে বিভিন্ন রকমের লেবেল লাগিয়ে গাইট বন্দী হয়ে লুঙ্গীগুলো চলে যাচ্ছে পাইকারদের হাতে। হরেক নামের লেবেলগুলোতে কৌশলে ‘হাতে বুনানো তাঁতের লুঙ্গী’ ও ‘জয়পাড়া লুঙ্গী’ ব্যবহার করা হয়েছে। যাতে ভোক্তারা সহজেই বুঝে নেয় যে এগুলো জয়পাড়ার প্রান্তিক তাঁতীতের হাতে বুনানো ঐতিহ্যবাহী লুঙ্গী। আর এভাবেই আব্দুর রহমানের কৌশলে দামে ও মানে যৌথ প্রতারণার স্বীকার হচ্ছে লক্ষ লক্ষ সাধারন ক্রেতা।
জানা যায়, কিছু পাইকারদের সঙ্গে আঁতাত করে এবং কিছু পাইকারদের চোখে ধুলো দিয়ে সারাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে আব্দুর রহমান। ‘জয়পাড়া লুঙ্গী’ নামে থাকা ফেসবুক আইডিতে প্রচারনায়ও কৌশলী প্রতারণার ছাপ লক্ষ করা যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রহমানের বাড়ির এক শ্রমিক জানান, ‘এই বাড়িতে কোথাও দোহার-নবাবগঞ্জের তাঁতীদের হাতে বুনানো কোন লুঙ্গী খুঁজে পাবেন না। ট্রাকে ট্রাকে লুঙ্গীর রুল আসে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ থেকে। যা রুল আকারে নিচে রাখা আছে। আমাদের কাজ শুধু কেটে ভাঁজ করে লেবেল লাগিয়ে গাইট বাঁধা।’  কথা   হয়   জয়পাড়ার কয়েকজন প্রান্তিক তাঁতীর সঙ্গে। তাঁরা আক্ষেপ করে বলেন, আমরা পুরো পরিবার মিলে দিনরাত পরিশ্রম করে মানসম্মত লুঙ্গী তৈরি করে জয়পাড়া লুঙ্গীর এই সুনাম তৈরি করেছি। কিন্তু এদের (আব্দুর রহমান) মতো কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই সুনাম বিক্রি করে রাতারাতি কোটিপতি হয়ে যাচ্ছে। আর আমরা ন্যায্য দাম পাচ্ছি না।
তাঁরা বলেন, পাওয়ার লোম ফ্যাক্টরীতে তৈরি লুঙ্গী হস্তচালিত তাঁতের লুঙ্গীর তুলনায় অপেক্ষাকৃত নি¤œমানের হয় এবং উৎপাদন খরচও অনেক কম। যার ফলে পাওয়ার লোম ফ্যাক্টরীতে তৈরি লুঙ্গীর গায়ে হস্তচালিত তাঁতের লুঙ্গী লেবেল লাগিয়ে বিক্রি করলে অধিক মুনাফা হয়। আর তাতে যদি থাকে ‘জয়পাড়া লুঙ্গী’র তকমা লাগানো লেবেল, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। তাঁরা এ জাতীয় কৌশলী প্রতারণার রাহুগ্রাস থেকে দোহার-নবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহি হস্তচালিত তাঁত শিল্পকে রক্ষার আকুতি জানান।
অবাক করার বিষয় হচ্ছে, যেখানে দোহার-নবাবগঞ্জের হস্তচালিত তাঁত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাঁতীরা দিনমজুরের কাজ করছে সেখানে আব্দুর রহমান তাঁর চারতলা ভবনে শতাধিক শ্রমিক নিয়োজিত করে ভাগ্যবিড়ম্বিত তাঁতীদের শ্রমঘামে তৈরি সুনামকে কৌশলে বিক্রি করে বাড়ি-গাড়ি ও সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জয়পাড়ার বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক ম্যানেজারের সাথে রয়েছে তাঁর বিশেষ সখ্যতা। চিটিংবাজির এ ব্যবসা নির্বিঘœ করতে অনেককেই তিনি খুশি রাখেন লুঙ্গী উপহার দিয়ে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় কথিত জয়পাড়া লুঙ্গীর কর্ণধার আব্দুর রহমানের সাথে। তিনি দাবি করেন, আমার এখানে হাতে বুনানো তাঁতের লুঙ্গী ও মিলের লুঙ্গী দুটোই আছে। তার কথার প্রেক্ষিতে অনুসন্ধানী টিমের প্রশ্ন ছিল, আপনার নিজস্ব কয়টি তাঁত আছে বা জয়পাড়ার কোন কোন তাঁতীদের কাছ থেকে আপনি লুঙ্গি কেনেন। এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। উল্টো বলেন, জয়পাড়ার নাম ব্যবহার করে অনেকেই নকল লুঙ্গী তৈরি করছে। প্রশাসন তো কিছুই করতে পারছে না। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ব্যবসা ভাল যাচ্ছে না, ব্যাংকের লোন দিয়ে ব্যবসা করছি।
এ বিষয়ে দোহার-নবাবগঞ্জ উইভার্স কো-অপারেটিভ ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ইউনিয়ন লিঃ এর সভাপতি মো. রমজান আলী মল্লিক বলেন, আমাদের কাছেও অভিযোগ আছে যে, দোহারের কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ী কৌশলে পাবনা ও সিরাজগঞ্জের লুঙ্গী জয়পাড়ার লুঙ্গী বলে বাজারে চালিয়ে যাচ্ছে। লুঙ্গীর উৎপাদনে ‘জয়পাড়া’ নামটির দীর্ঘদিনের, যে সুনাম ওই চক্রটি কৌশলে বিক্রি করছে। জয়পাড়া থেকে তাঁতের লুঙ্গীর নমুনা পাবনা ও সিরাজগঞ্জ নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে পাওয়ার লোম ফ্যাক্টরীতে দেখতে হুবহু একরকমের লুঙ্গী রুল আকারে বানিয়ে এনে ‘জয়পাড়া’র নামটি কৌশলে ব্যবহার করে প্রতারণা করছে। যেখানে দোহারের তাঁতীরা কষ্টে দিনাতিপাত করছেন সেখানে জয়পাড়ার সুনাম বিক্রি করে অসাধু কিছু ব্যক্তি নিজের স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে। আমাদের সমিতির মিটিং-এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে একাধিকবার। এর মধ্যে লুঙ্গী ব্যবসায়ী আবেদ আলী মেম্বারের ছেলে আব্দুর রহমানের নামটিও উঠে এসেছে।
সুত্রঃ প্রিয় বাংলা
[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 157 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ