টেলিফোনে আড়িপাতার ক্ষমতা পেল দুদক

Print

* সন্দেহভাজনদের গতিবিধি অবস্থান ও কথোপকথন রেকর্ড হবে

* পলাতক আসামির অবস্থান শনাক্ত হবে প্রযুক্তির মাধ্যমে

* দুদকের গোয়েন্দা ইউনিটকে এসব কাজে লাগানো হবে

ফোনে আড়িপাতার ক্ষমতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মোবাইল ট্রেকিং সংক্রান্ত অনুমোদন পেয়েছে সংস্থাটি। এখন থেকে সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজের গতিবিধি অনুসরণ, তাদের কথোপকথন রেকর্ড, চলাফেরা ও পলাতক আসামির অবস্থান শনাক্তে দুদক এই সুবিধা ব্যবহার করবে। এতে তদন্তে বড় ধরনের সহায়তা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সহায়তায় দুদক পুরো কাজটি পরিচালনা করবে। এর দায়িত্বে থাকছে বিশেষভাবে দক্ষ একটি টিম। এই টিমের সদস্যরা সন্দেহভাজন বা দুদকের তালিকাভুক্ত ব্যক্তির গতিবিধি অনুসরণসহ তাদের ওপর নজরদারি করবে। তাদের সবকিছু (কথা, গতিবিধি, অবস্থান ইত্যাদি) ট্রেকিং করে সার্ভারে ধারণ করে রাখবে। দুদকের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে প্রযুক্তিনির্ভর এ কাজটি দুদক শুরু করতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ  বলেন, আমরা এ ধরনের একটা উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। ইতিমধ্যে মাঠ পর্যায়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ট্রেকিংয়ের বিষয়টি এককভাবে নিজের হাতে রাখার যৌক্তিকতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কারও কথা বলার স্বাধীনতা যেন খর্ব না হয় সেটা আমি নিজে নিশ্চিত করতে চাই। তবে যাদের বিষয়ে দুর্নীতির অর্ভিযোগ আছে তারা এর আওতায় পড়বেন। তিনি জানান, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের দুর্নীতির বিষয়ে জনশ্র“তি আছে, সবাই যাদের দুর্নীতির বিষয়ে জানে তাদের বিষয়ে গোপনে আমরা তথ্য সংগ্রহ করব।

গত বছর ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবসের এক অনুষ্ঠানে দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছিলেন, নতুন বছরে (২০১৮) তালিকা করে বড় বড় দুর্নীতিবাজকে ধরা হবে। সরকারি সেক্টরের দুর্নীতিবাজদের বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদকের চেয়ারম্যান নতুন বছরে কি করবেন তার ধারণা আগেই জানিয়েছিলেন এবং সেভাবেই দুদক পরিকল্পনাছক চূড়ান্ত করেছে। যার মধ্যে মোবাইল ট্রেকিং কার্যক্রম অন্যতম। দুদক চায় সংস্থাটির কার্যক্রম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ও ভারতের সেন্ট্রল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (সিবিআই) আদলে পরিচালনা করতে। দুদকের এক মহাপরিচালক সে ধারণা দিয়ে  বলেন, আমাদের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় রয়েছে দুদককে একটি প্রশিক্ষিত ব্যতিক্রমধর্মী তদন্ত সংস্থায় পরিণত করা। সেভাবেই দুদকের প্রশাসনিক ও সাংগঠনকি কার্যত্রম হাতে নেয়া হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ লেনদেন হাতেনাতে ধরার কাজটি আরও গতি পাবে বলে জানান তিনি।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটি মোবাইল ট্রেকিংয়ের বিষয়ে ইতিমধ্যে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। কিভাবে কার্যক্রমটি পরিচালিত হবে তারও ধারণা নিয়েছে। দুদকের একজন পদস্থ কর্মকর্তা  বলেন, আমাদের প্রযুক্তি অফিস বা ঘরের চার দেয়ালের খবরও বের করে আনবে। ঘরে বা অফিসে বসেও যদি কেউ দুর্নীতি বা অবৈধ টাকা লেনদেনের বিষয়ে কথা বলেন, দুদক চাইলে অনুসন্ধানের স্বার্থে ওই খবরটিও ট্রেকিংয়ের মাধ্যমে ধারণ করে রাখতে পারবে। তবে এটা শুধু তাদের ক্ষেত্রেই করা হবে, যাদের বিষয়ে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ আছে। তিনি বলেন, ঘুষ লেনদেনের অনেক ঘটনা আমরা আগেভাগে জানতে পারব। কারণ আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতেই কাজটি করা হয়। ঘুষ লেনদেনের আগে যখন যে অবস্থায়ই আলোচনা বা কথোপকথন হোক না কেন, তা দুদক আগেভাগে জানতে পারবে। কিভাবে তা জানা যাবে সে বিষয়ে আগাম আর কিছু বলতে চাননি ওই কর্মকর্তা। দুদক জানায়, দুর্নীতিতে জড়িত সরকারি কর্মকর্তারাও আসবেন মোবাইল ট্রেকিংয়ের আওতায়। কোনো প্রকল্প গ্রহণে বা প্রকল্পের অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে যদি অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটে সোর্সের মাধ্যমে সেই খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ফোনে আড়ি পাতা হবে। একইভাবে সরকারি ক্রয়, বিক্রয়, টেন্ডার, কেনাকাটাসহ যেসব খাতে দুর্নীতি বেশি হয় ওই খাতের দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করে জড়িত কর্মকর্তাকে গোপনে অনুসরণ করা হবে। প্রয়োজনীয় তথ্য হাতে রাখার পর তাকে আটক বা গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

বড় বড় দুর্নীতির ঘটনায় অনুসন্ধান পর্যায়েই জড়িত সন্দেহভাজন অনেকের বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর দুদক আসামির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে পুলিশের বিশেষ শাখা ও ইমিগ্রেশনে চিঠি দেয়। সঙ্গে দেয়া হয় আসামির নাম, ঠিকানা, পাসপোর্ট নম্বরসহ তালিকা। কিন্তু এরপরও অনেকে দেশ থেকে চলে যায়। অনেক আসামি দেশে না থাকলেও দুদক খুঁজে পায় না। দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, তাদের (পলাতক আসামি) অবস্থান শনাক্ত করাসহ কোনো আসামি দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছে কিনা আগেভাগে তা জানার জন্য প্রযুক্তির সহায়তা নেয়া হবে। মোবাইলে আড়ি পেতে তার প্ল্যান-পরিকল্পনা জেনে পরবর্তী অ্যাকশনে নামবে দুদকের বিশেষ টিম।

এদিকে দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিটের মাধ্যমে রাঘববোয়ালদের দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে দুদক। দুদকের পঞ্চবার্ষিকী কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা (২০১৭-২০২১) বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে গোয়েন্দা ইউনিটের কার্যক্রম। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই, অভিযোগের অনুসন্ধান ও মামলা তদন্ত করতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয় দুদককে। পাশাপাশি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, সরকারি-বেসরকারি দফতর ও বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক নিজেও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। এতে অহেতুক কালক্ষেপণসহ অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে দেখা যায় অনেক অভিযোগ ভিত্তিহীন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ে নির্ভুল অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিটের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহে মনোনিবেশ করেছে দুদক।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুদকের কমিশনার ড. নাসির উদ্দীন বলেন, আমাদের পঞ্চবার্ষিকী কৌশলগত কর্মপরিকল্পনায় গোয়েন্দা ইউনিট গঠনের বিষয়টি প্রাধান্য পায়। দুদককে একটি বিশেষায়িত সংস্থায় রূপান্তর করতে যা যা প্রয়োজন কর্মপরিকল্পনায় সব রয়েছে।

এদিকে দুদকের হটলাইন ১০৬-এ আসা অভিযোগ থেকেও কিছু কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি বিভিন্ন দফতরের দুর্নীতির খবরই বেশি আসছে হটলাইনে। দুদকের একজন পরিচালকের নেতৃত্বে গঠিত বাছাই কমিটির সদস্যরা প্রতিনিয়তই দুর্নীতির তথ্য ডাটাবেজ করে কমিশনের নজরে আনছেন। ওই অভিযোগ থেকেও কিছু দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির বিষয়ে ধারণা পেয়েছে দুদক। যাদের বিষয়ে অচিরেই গোপন অনুসন্ধানসহ আড়িপাতার কাজটি শুরু করবে বলে জানা গেছে।

  • যুগান্তর
[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 123 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ