নথিজটে খালেদার জামিন

Print

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালতে পাঁচ বছরের সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের ওপর শুনানি শেষ হয়েছে। তবে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তির অপেক্ষা এখনই ফুরাচ্ছে না। বিচারিক আদালতের নথি আসার পর এ বিষয়ে আদেশ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন হাইকোর্ট।

গতকাল বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ উভয় পক্ষের শুনানির পর এ আদেশ দেন। বিকাল সাড়ে ৩টায় এ মামলার শুনানি শেষ হয়। গত ২২ ফেব্রুয়ারি একই বেঞ্চ খালেদা জিয়ার আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে ১৫ দিনের মধ্যে বিচারিক আদালত থেকে মামলার নথি পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছিল। সেই সময় শেষ হতে এখনো ১১ দিন বাকি। ফলে খালেদা জিয়া জামিন পাবেন কি না- তা জানতে আরো অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। তবে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত খালেদা জিয়ার অর্থদণ্ড স্থগিত রাখা হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে ৮ ফেব্রুয়ারি সাজার আদেশ দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৫-এর বিচারক আখতারুজ্জামান। এরপর থেকে তিনি নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারে বন্দি রয়েছেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে আরো ৩৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এখন পর্যন্ত অন্য কোনো মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তাকে আর কোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে না। তবে বিএনপি নেতা-কর্মীরা আশ্বস্ত হতে পারছেন না। তাদের ধারণা খালেদার বন্দিজীবন দীর্ঘ করতে সরকার সব চেষ্টাই করবে।
১১৬৮ পৃষ্ঠার রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর গত ২০ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে আপিল করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবীরা। ২২ ফেব্রুয়ারি বিষয়টি আদালতে উঠলে তখনই জামিন আবেদন করা হয়। মূল রায়সহ ১২২৩ পৃষ্ঠার আপিল আবেদনে ৪৪টি যুক্তি দেখিয়ে খালেদা জিয়ার খালাস চাওয়া হয়। আর ৮৮০ পৃষ্ঠার জামিন আবেদনের মধ্যে ৪৮ পৃষ্ঠাজুড়ে ৩২টি যুক্তিতে খালেদা জিয়ার মুক্তি চাওয়া হয়।
খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানান, জামিন আবেদনের যুক্তিতে বলা হয়, আবেদনকারীর বয়স ৭৩ বছর। তিনি শারীরিকভাবে বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন। তিনি ৩০ বছর ধরে গেঁটেবাত, ২০ বছর ধরে ডায়াবেটিস, ১০ বছর ধরে উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে আয়রন ঘাটতিতে ভুগছেন। ১৯৯৭ সালে খালেদা জিয়ার বাঁ হাঁটু এবং ২০০২ সালে ডান হাঁটু প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এ কারণে তার গিঁটে ব্যথা হয়, যা প্রচ- যন্ত্রণাদায়ক। এ কারণে তাকে হাঁটাহাঁটি না করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। শারীরিক এসব জাটিলতার কারণ বিবেচনায় নিয়ে জামিন মঞ্জুর করার আর্জি জানানো হয় আবেদনে। আরেক যুক্তিতে বলা হয়, উপমহাদেশ ও দেশের উচ্চ আদালতের দীর্ঘ ঐতিহ্য অনুযায়ী, আসামি নারী হলে তার অনুকূলে জামিন বিবেচনা করা হয়।
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ‘নির্মূলের’ জন্য ২০০৭-০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলাটি করেছিল দাবি করে জামিনের আরেক যুক্তিতে বলা হয়, মামলার প্রথম অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা জামিন আবেদনকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি। তাছাড়া জামিন আবেদনকারী বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসন। বিচারিক আদালত এ বিষয়টি উপেক্ষা করেছে। যে মামলায় তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, হয়রানি করার জন্য। ফলে তার জামিন আবেদন গ্রহণের সবিনয় আর্জি জানাচ্ছি।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান এতিমদের টাকা আত্মসাৎ করেনি। তিনি বলেন, তিনি যতদূর জানেন, ইতিহাসে এর আগে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে এতিমদের টাকা এভাবে কেউ আত্মসাৎ করেনি। সবচেয়ে বড় কথা এ চেক দিয়ে উনার ছেলে তারেক রহমান, উনার বোনের ছেলে মমিনুর রহমান ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, একই বাড়িতে থেকে যখন পুত্র ব্যাংকের টাকা উত্তোলন করেন তখন তার দায়-দায়িত্ব কীভাবে মা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এড়াতে পারেন? যেখানে এ অ্যাকাউন্টি খোলা হয়েছিল তার নির্দেশে, অ্যাকাউন্টের নামই ছিল প্রাইম মিনিস্টার অরফানেজ ফান্ড।
এদিকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়ে যে দুটি যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। তিনি বলেন, তাদের জামিন আবেদনে যে দুটি যুক্তি ছিল এর একটি হচ্ছে স্বল্প মেয়াদে সাজা, অপরটি তিনি অসুস্থ। এর বিরোধিতা করে তিনি আদালতে বলেছেন, অসুস্থতার স্বপক্ষে আদালতে কোনো মেডিকেল রিপোর্ট দাখিল করা হয়নি। স্বল্প মেয়াদের সাজায় জামিন দেয়ার কোনো নজির আপিল বিভাগের রায়ে নেই।
এ মামলায় খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানসহ অপর পাঁচ আসামির প্রত্যেককে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়েছে। বাকি চার আসামি হলেন সাবেক মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, সাবেক সাংসদ ও ব্যবসায়ী কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ ও জিয়াউর রহমানের ভাগনে মমিনুর রহমান। এর মধ্যে পলাতক রয়েছেন তারেক রহমান, কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান। আসামিদের প্রত্যেককে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার করে জরিমানা করা হয় রায়ে।
মামলার শুনানির জন্য দুপুর ২টায় হাইকোর্টের এজলাসে আসেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিম। কিন্তু, আদালতের ভেতরে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের মাত্রাতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তারা। ভিড় কমানোর নির্দেশ দিয়ে ১০ মিনিটের জন্য এজলাস ছাড়েন তারা। পরে দুপুর ২টা ৩৪ মিনিটে শুনানি শুরু হয়।
আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি শুরু করেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী। পরে অন্য আইনজীবীরা তাকে সহায়তা করেন। শুনানিতে খালেদা জিয়ার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার রফিক উল হক, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রমুখ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আর মামলার বাদী দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান।
আদালতে বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান, মির্জা আব্বাস ও খায়রুল কবির খোকন প্রমুখ।
এতিমদের সহায়তা করার উদ্দেশে বিদেশ থেকে পাঠানো ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করার অভিযোগে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই দুদক এ মামলা করে। তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট ছয়জনের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দেন দুদকের উপপরিচালক হারুন অর রশীদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আদালত খালেদাসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এরপর তদন্ত কর্মকর্তাসহ ৩২ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন আদালত।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে অন্যায়ভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। সরকারি এতিম তহবিলের আর্থিক দায়িত্ববান বা জিম্মাদার হয়ে বা তহবিল পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত হয়ে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ করে পরস্পর যোগসাজশে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যা দ-বিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারার অপরাধ।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে বলা হয়Ñ প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ১২ দশমিক ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার আসে, যা বাংলাদেশি টাকায় তৎকালীন ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ১৯৯১ সালের ৯ জুন থেকে ১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই অর্থ দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো এতিমখানায় না দিয়ে অস্তিত্ববিহীন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গঠন করেন। অথচ কোনো নীতিমালা তিনি তৈরি করেননি, করেননি কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থাও। অথচ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল থেকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা অস্তিত্ববিহীন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে পাঠান। পরে ওই টাকা আত্মসাৎ করেন, যার জন্য তিনি দায়ী। তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে বলেনÑ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় থেকে নিজের পদমর্যাদা বলে সরকারি এতিম তহবিলের আর্থিক দায়িত্ববান বা জিম্মাদার হয়ে বা তহবিল পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত হয়ে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ করে দ-বিধির ৪০৯ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অপরাধ করেছেন। এদিকে দুর্নীতি মামলার বিচারিক আদালতের মূল নথি উচ্চ আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। তবে কবে নাগাদ এটা পাঠানো হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিশেষ জজ ৫-এর বেঞ্চ সহকারী (পেশকার) মোকাররম হোসেন। মোকাররম হোসেন বলেন, তারা উচ্চ আদালতের আদেশ পেয়েছেন। তবে মূল নথি উচ্চ আদালতে পাঠানোর আগে কিছু কাজ করতে হয়। সে কাজগুলো শেষ হলেই তারা নথি পাঠিয়ে দেবেন। মূল নথি কবে পাঠানো হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নথি স্যারের (বিচারক) কাছে আছে।

আমার সংবাদ
[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 247 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ