আর নয় খাই খাই, ক্ষুধার কথা ভুলে যাই

Print

ক্ষুধার রাজ্যে পূর্নিমার চাঁদ যেন এক ঝলসানো রুটি। কথাটি দরিদ্র বা ক্ষুধার্ত মানুষদের জন্য প্রযোজ্য হলেও কিছু কিছু স্থুল বা মোটা মানুষদের জন্য কথাটি আরো বেশী প্রযোজ্য, কারণ তারা ক্ষুধা একদম সহ্য করতে পারেন না। একবার যখন তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করে খাওয়ার জন্য ঘরে কিছু নাই বা আছে কিন্তু খেতে পারছে না , তখন মনে হয় পুরো পৃথিবীটাকেই সে চিবিয়ে খাবে । অনেকে তো খাওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে যায়। তাদের হাত পা কাঁপতে থাকে। কেউ কেউ ক্ষুধার জন্য প্রায় অজ্ঞান হয়ে যায়। কিন্তু কেন এই অসহনীয় ক্ষুধা ? কেন এই প্রতিবন্ধকতা ? কেন এই দুর্বলতা?

এটা হয় সাধারণত যাদের শরীরে অনেক চর্বি জমে আছে এবং শর্করা মেটাবলিজম করে চলছে, বা গ্লুকোজ দিয়ে চলছে তাদের ক্ষেত্রে ।

আসলে শর্করা মেটাবলিজম বলতে আমরা কী বুঝি?

প্রাথমিকভাবে শর্করাকে বা চিনিকে আমরা ফুয়েল হিসেবে ব্যবহার করছি। আমরা যাই খাচ্ছি যেমন ভাত, রুটি, আলু, চিনি সবকিছুই পাকস্থলী থেকে চিনি হিসেবে আমাদের রক্তে চলে যাচ্ছে। ওটা আবার ইনসুলিনের মাধ্যমে কোষের ভেতর প্রবেশ করে ATP বা শক্তি উৎপন্ন করে । শর্করা জাতীয় জিনিস যখন আমরা বেশি খেয়ে ফেলি তখন সেটা গ্লাইকোজেন এবং আরো বেশি খেলে সেটা চর্বি হিসেবে শরীরে জমা হয়।

আমরা যখন প্রতিবার খাচ্ছি তখন রক্ত এই সুগার গুলোকে কোষের ভেতরে ঢুকানোর জন্য ইনসুলিনের সাহায্য নিচ্ছে। অনেকেই হয়তো জানেন এই ইনসুলিন একটি গঠনমূলক হরমোন যেটাকে বলা হয় এ্যানাবলিক হরমোন। এই হরমোনের কাজ হচ্ছে কোন কিছু ধ্বংস বা ভেঙে ফেলতে বাধা দেয়া ; তার কাজ হলো জমা করে রাখা। তাই ইনসুলিনের উপস্থিতিতে চর্বি গলতে পারে না। ইনসুলিন লাইপোজেনেসিস বা চর্বি জমা করতে সহায়তা করে এবং লাইপোলাইসিস বা চর্বি ভাংগতে বাঁধা প্রদান করে। তাই ব্রেন শরীরে জমে থাকা চর্বিটাকে দেখতে পারেনা এবং সেটা গলাতেও কোন কার্যকরী ভূমিকা পালন করেনা। এভাবে একসময় চর্বি জমতে জমতে পুরু হয়ে যায় । চামড়ার নিচে, যে চর্বি গুলো জমে বা মেদভুড়ি বেড়ে যায় সেটা সাধারণত দৃশ্যমান হয়, কিন্তু হার্ট, লিভার, কিডনি, ব্রেন এবং রক্ত নালীর ভেতর যে চর্বি জমে গিয়েছে সেটা কিন্তু দৃশ্যমান হয়না বা আমরা খালি চোখে দেখতে পাইনা, কিন্তু কিছু কার্যপ্রণালীর মাধ্যামে আমার বুঝতে পারি আমাদের ভেতরে কিছু একটা হচ্ছে। যেমন আগের মতো দৌঁড়াতে পারছি না, সামান্য কাজ করলেই ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি, সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই বুক ধড়ফড় করছে। এই যে উপসর্গ গুলো আপনাকে জানান দিচ্ছে আপনার শারীরিক অসামঞ্জস্যের কথা, আসলে এটা হলো কার্বোহাইড্রেট মেটাবলিজম বা শর্করা মেটাবলিজম দিয়ে যারা চলছে সেটার প্রক্রিয়া। যারা শর্করা মেটাবলিজম দিয়ে চলছে এবং চর্বি গুলো জমা করছে সেটা কিন্তু অনেক শক্তিশালী যদি আমরা সেটাকে জ্বালানী হিসাবে ব্যাবহার করি; কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক বা দেহ সেটা দেখতে পারছে না, বা চিনতে পারছেনা ইনসুলিন মস্তিস্ককে জমে থাকা চর্বি জ্বালানী হিসাবে ব্যাবহার করতে বাধা দিচ্ছে। একটি চর্বি ৯ ক্যালরি শক্তি উৎপন্ন করে অপর দিকে শর্করা বা প্রোটিন ৪ ক্যালরি করে শক্তি উৎপন্ন করে।

আমরা বারবার শর্করা খাওয়ার ফলে রক্তে ইনসুলিন বেশি আসছে। এক সময় ইনসুলিন বেশি পরিমাণ আসার ফলে সেটা আর ভালো ভাবে কাজ করেনা, এবং আরো বেশি পরিমাণ ইনসুলিন প্রয়োজন পড়ে, এছাড়া কোষ গুলো ওভার লোডেড হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াকে ইনসুলিন রেজিস্ট্রেনস বলে। ইনসুলিন যত বেশি আসবে রেজিস্ট্রেনস তত বেশি হবে এবং বারবার প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগবে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ খেলেও শরীরে শক্তি পাওয়া যাবেনা, দুর্বল লাগবে এবং ঘুম ঘুম ভাব হবে। লক্ষ্য করে দেখবেন যারা একটু মোটা তারা যেখানে সেখানেই নাক ডাকা শুরু করে।

অপর দিকে কেউ যদি স্বাস্থ্য কমানোর জন্য খাওয়া কমিয়ে দেয় সেক্ষেত্রেও তার শরীর আরো দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়বে । মাথার চুল পড়তে শুরু করবে এবং হাত পায়ের নখগুলো ভংগুর হয়ে যাবে । এছাড়া আরো কিছু মানসিক সমস্যা তার মাঝে পরিলক্ষিত হবে । তার মেজাজ খিটখিটে এবং জেদি স্বভাবের হয়ে যাবে। অল্পতেই সে রাগান্বিত হয়ে যাবে এবং যদি সুযোগ পায় তবে কারো গায়ে হাত তুলতেও সে দ্বিধাবোধ করবেনা।

চলা ফেরায় অসুবিধা বা শারীরিক অসুবিধা কারণে সে যখন কোন ডাক্তারের কাছে যায়, স্বাভাবিক ভাবেই ডাক্তার তার ওজন কমাতে বলেন। রোগী খাওয়া খাদ্য কমিয়ে দিচ্ছে বা বারবার অল্প অল্প খেতে চেস্টা করছে যেভাবে তাদের উপদেশ দেয়া হয়, তার ফলে কিন্তু ইনসুলিন শরীরে বার বার আসছে। ইনসুলিন ব্রেনকে সন্চিত চর্বি দেখতে দিচ্ছে না । আগে যে জায়গায় সে চার হাজার ক্যালরি খেত এখন সে খাচ্ছে দুই হাজার ক্যালরি। তার শরীর তখন সেট পয়েন্ট নামিয়ে সেটা এ্যাডজাস্ট করে নেয় সে যাই খাই তার অর্ধেকটা শরীর চর্বি হিসেবে জমা করে রাখে এবং বাকী অর্ধেক শক্তি দিয়ে বডিকে চলতে হয় অর্থাৎ চলার জন্য শক্তির যা প্রয়োজন ছিলো তার চেয়ে অনেক কম শক্তিতে দেহকে চলতে হয় BMR কমিয়ে শরীরে এটা compensate করে ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে কিন্তু সন্চিত চর্বি না গলিয়ে বরং আরো জমাতে থাকে এবং শক্তির আধার চর্বিকেও মস্তিষ্ক চিনতে পারেনা এবং সেটা কাজেও লাগাতে পারেনা ।

এখন এই দুই হাজার ক্যালরির অর্ধেক এক হাজার ক্যালরি যখন সে শরীরে জমা করে রাখছে চর্বি হিসাবে তখন পুরো শরীর চলছে মাত্র এক হাজার ক্যালরী দিয়ে ফলে তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে, এবং তার সাথে দুর্বল হয়ে পড়ছে, মস্তিষ্ক, লিভার, কিডনি, হার্ট এবং শেষমেশ দুর্বলতা তাকে গ্রাস করে নেয় কিন্তু পেটের চর্বি পেটেই স্হায়ী আসন গেড়ে নেয় একটা সময় আমরা হাল ছেড়ে দিয়ে পূর্ন উদ্যোমে আবার আগের চেয়েও বেশী বেশী খেতে আরম্ভ করি এবং ওজনও আগের চেয়ে আরো অনেক দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে।

এখন প্রশ্ন হলো এ প্রক্রিয়া থেকে বাঁচার উপায় কী ?

বাচাঁর উপায় হলো আমাদের ম্যাটাবলিজম প্রক্রিয়াকে পরিবর্তন করে নিতে হবে। আগে যেমন আমাদের শরীর পরিচালিত হতো শর্করা দিয়ে এখন শরীর পরিচালিত করতে হবে চর্বি দিয়ে। কারণ শর্করাতে ইনসুলিন অনেক বেশি পরিমাণ নিঃসরণ হয় কিন্তু চর্বিতে সেটা হয়না। এছাড়া প্রোটিন খেলেও যথেস্ট পরিমাণ ইনসুলিন নিঃসরণ হয় । তাই যে খাবার গুলোতে শর্করা বিদ্যমান সে শর্করা গুলো বাদ দিতে হবে, সেটা যদি স্বাস্থ্যকর হয় তবুও, শুধু মাত্র শাক সবজি ছাড়া। চিনি, মধু, মিষ্টি ফল এগুলোও এড়িয়ে চলতে হবে কারণ মধু, এবং মিষ্টি ফলে চিনি আছে যা আমাদের শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হয়। এছাড়া প্রোটিনও পরিমিত খেতে হবে আর বেশি পরিমানে খেতে হবে ভালো ফ্যাট জাতীয় খাদ্য। তো ভালো ফ্যাট কোন গুলো সেটাও আপনাদের জানতে হবে, যেমন, মাছের তেল, মাছের ডিম, ডিমের কুসুম, খাঁটি ঘি, খাঁটি মাখন, এক্সট্রা ভার্জিন ওলিভয়েল, কোকোনাট ওরগানিক ওয়েল, MCT oil, যেকোনো প্রকার বাদাম, বাড়িতে বানানো পিনাট বাটার।

আপনি যখন শর্করা খাওয়া কমিয়ে দিয়ে উল্লিখিত ফ্যাট জাতীয় খাদ্য গুলো ৭০% বা ৮০% খাওয়া শুরু করবেন তখন আপনার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রতঙ্গ থেকে শরীরে সঞ্চ‌িত সুগার এবং গ্লাইকোজেন বার্ন হতে শুরু করবে। যখন এই সঞ্চ‌িত সুগার এবং গ্লাইকোজেন নিঃশেষ হয়ে যাবে তখন আর শরীর, কোথাও খাদ্য খুঁজে পাবেনা আর তখনই শরীরে জমে থাকা শক্তির আধার চর্বি গলতে শুরু করবে এবং সেখান থেকে সে তার প্রয়োজনীয় খাদ্য গ্রহন করা শুরু করবে। আর তখনই শুরু হবে মজা। তখন আর আপনার ক্ষুধা লাগববে না, এবং বেশি খেতেও পারবেন না, কারণ আপনার শরীর এবং মস্তিষ্ক জেনে গেছে প্রচুর চর্বি খাদ্য ভাণ্ডার হিসাবে শরীরে সন্চিত আছে যার জন্য অতিরিক্ত খাওয়ার প্রয়োজন পাড়বেনা।

একবার যদি আপনার শরীর ফ্যাট বার্নিং শিখে যায় তখন আপনার স্বাস্থ্য কমানো ঠেকায় কে? তবে এই প্রক্রিয়া শুরু হতে আপনার পাঁচ থেকে সাতদিন সময় প্রয়োজন। এই সাতদিনের ভেতরে আপনার শরীর শর্করা বা চিনি দিয়ে নয় বরং ফ্যাট দিয়ে চলতে শুরু করবে। তখন আর আপনি দুর্বল হবেন না, এমন কী না খেয়ে থাকলেও, কারণ যখন শরীরে শারীরিক শক্তি প্রয়োজন হবে তখন সে তার সঞ্চ‌িত চর্বি থেকে শক্তি সঞ্জয় করবে। বাহিরের অতিরিক্ত খাবারের প্রয়োজন পাড়বেনা ; তবে বলে রাখা ভাল এই প্রক্রিয়াটি শুরু হওয়ার প্রথম তিন চারদিন আপনার খারাপ লাগতে পারে, সামান্য মাথা ঘুরা‌তে পারে, বা বেশি বেশি পানি পিপাসা লাগতে পারে, তো তাদের জন্য পরামর্শ হলো পানিতে সামান্য পরিমান হিমালয়ান পিংক সল্ট বা সাধারণ লবন মিশিয়ে খাবেন। এছাড়া প্রতিদিন একচি করে কচি ডাবের পানি খেতে পারেন।

আরেকটা বিষয় হলো আমরা যখন কোন খাবারের কথা খুব বেশি চিন্তা করি যেমন, বিরিয়ানি খাব, পোলাও খাব, খিচুড়ি খাব তখন আমাদের পাকস্থলী থেকে এসিড এবং পাচক রস নিঃসরণ হয় এটাকে বলে সেফালিক ফেইজ; ( যেমন তেতুলের কথা মনে করলে জীভে পানি আসে) এছাড়া আমাদের সামনে যখন কেউ এই ধরনের খাবার খায় তখনও কিন্তু এসিড এবং পাচক রস গুলো নিঃসরণ হয় এবং আমরা ক্ষুধা অনুভব করি তাই যতটুকু সম্ভব এই ধরনের খাদ্য খাওয়ার চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিতে হবে এবং কেউ যদি আপনার সামনে খায় তখনও আপনার দৃঢ়তার সাথে মনস্থির করতে হবে এবং মনকে শান্ত করতে হবে, এই খাদ্য গুলো আপনার জন্য নয়। (এক্ষেত্রে রোজা খুব সাহায্য করে কিন্তু )
মনে রাখবেন আপনার খাদ্য নির্দিষ্ট যা খুবই স্বাস্থ্য সম্মত এবং উপকারী। এভাবে আমরা প্রাথমিক ভাবে ক্ষুধাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। এছাড়া গঠনমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখুন। যেমন ছবি আঁকা, গল্প, উপন্যাস বা ধর্ম গ্রন্থ পাঠ করা বা যারা যুবক আছে তারা খেলাধুলা বা সামাজিক কোন কাজে জড়িয়ে থাকা এবং যেকোনো পার্টি বা ফুড ফাংশন থেকে দূরে থাকা বা গেলেও আপনার জন্য নির্দিস্ট খাবারের বাইরে কিছু না খাওয়া । এভাবে কয়েক দিন আপনাকে ক্ষুধাকে ভুলে থাকতে হবে ।

এটা অবশ্য প্রথম কয়েক দিন আপনাকে মেনে চলতেই হবে। যখন আপনার শরীর ফ্যাট বার্নিং শিখে যাবে তখন আর আজে বাজে কিছু খেতে ইচ্ছে হবে না, বা ক্ষুধাও আপনাকে আর জ্বালাতন করবেনা । আর তারপর থেকেই একটানা ৭ টি রোজা বা ফাস্টিং করা শুরু করুন। কিভাবে রোজা বা ফাস্টিং করবেন তা অন্যান্য লেখায় বলা আছে।

তো আজ থেকে শুরু হয়ে যাক, ক্ষুধার বিরুদ্ধে সংগ্রাম 💪

আর নয় খাই খাই
ক্ষুধার কথা ভুলে যাই
ডায়েট মেনে চলবো
সুস্থ জীবন গড়বো।

লেখায় Azad Abul Kalam

Edited and published by :
ডাঃ মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর কবির

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 191 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ