প্রাণঘাতী করোনায়: রাষ্ট্রের আইন মানতে নয়, নিজে বাঁচাতে ঘরে থাকুন

Print

মুহাম্মদ সেলিম হক:

এই লেখাটি লিখার আগেও মহামারি করোনা নিয়ে আমার চিন্তা ভাবনার একগুচ্ছ এলোমেলো কথা পাঠকের কাছে তুলে ধরেছিলাম। এটি আমার হোম কোয়ারেন্টাইন ও করোনা বিষয়ক দ্বিতীয় পর্ব হয়তো। অবশ্যই আমি কোন জ্ঞানী কিংবা রোগতত্ত¡ বিশেষজ্ঞ কেউ নই। তারপরেও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে পাঠক হিসেবে পাঠকের কাছে বিছিন্ন কিছু কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। ভুল তথ্য মার্জনীয়।

অনেকের মনে আছে হয়তো আজ থেকে ২০ বছর আগে পৃথিবী ধ্বংস হওয়া নিয়ে হইচই পড়েছিলো। সম্ভবত ২০০০ সালের ৫ মে এবং ২০১২ সালের দিকে ২৯ শে এপ্রিলে পৃথিবী ধ্বংসের ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলো। বিশ্ব মিডিয়ায়ও এটা নিয়ে লেখালেখি দেখেছিলাম। কিন্তু কিছু লোক তা নিয়ে মাতামাতি করলেও তার প্রভাব মানব বসবাসকারী গ্রহে কিছু ঘটেনি (ইনশাল্লাহ্)।

অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অনেক বারই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা এসেছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত না হলেও পৃথিবীকে আতঙ্কিত করার মতো ঘটনা কম ছিল না। দেশে দেশে যুদ্ধ, দুর্ঘটনা, সোভিয়েত বনাম যুক্তরাষ্ট্রের শীতল যুদ্ধ, অসংখ্য ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, সুনামির মতো ঘটনা উল্লেখযোগ্য।

তবে বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বকে এক যোগে আতঙ্কিত করতে পেরেছে একমাত্র নভেল করোনা ভাইরাস এবং এর দ্বারা সংঘটিত কোভিড-১৯ রোগ। ধনী থেকে দরিদ্র সকলেই এ রোগ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে এবং হচ্ছেও। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি থেকে শুরু করে অতি সাধারণ মানুষ কেউ-ই করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ নয়।

এবার বলছি, বাংলাদেশের কথা। ২৫ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর মানুষ থেকে করোনার সচেতনতা কেমন জানি ঢিলে হয়ে যায়। তখন বাড়ি ফেরার ধুম। যেন ঈদের আনন্দ আর খাবার সংগ্রহটা তাদের সামনে বড় কাজ। সব কিছু বাদ দিয়ে তাদের চিন্তা খাদ্য দাও, ত্রাণ দাও। যেন খাবারের অভাবে লাশের বন্যা পড়েছে দেশে।

ত্রাণদাতারা ছুটছে ট্রাকের উপর ট্রাক আর ব্যাগে সয়লাব। মানুষের ভীড় ট্রাকে নয়। ড্রামে ড্রামে লুকিয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসছে। কে থাকে ঘরে। মাত্র কটা দিনে ঘরে থাকলে মানুষ যেনো মরে যায়। উতরে পড়ে ‘বিত্তবান শ্রেণিদের’ নিয়ে। কে দেখবে তাদের। এদের কথা কে ভাববে। দিনে এনে দিনে খায় এমন শ্রেণির মানুষের ধারণা এরা কোথা থেকে খাবো? কে তাদের খাওয়াবেন।

মানুষের এ অবস্থা দেখে মনে পড়ে জগৎ বিখ্যাত দার্শনিক সেক্সপিয়ারের একটি কথা। তিনি বলেছিলেন, “পৃথিবী একটি নাট্যশালা” সত্যিই তো তাই। কী বিচিত্রই না মানুষ। আরে বাচঁলে তো খাবার ও ত্রাণ। না বাঁচলে খাবার কে খাবে ত্রাণ। করোনা থেকে বাচাঁর জন্য কোনটা দরকার? ত্রাণের খাদ্যসামগ্রী আগে নাকি সচেতনতা? গুণে গুণে ১৫ টা দিন। ঘরে থাকলে হয়তো কমিউনিটির সংক্রমণটা হতো না। কিন্তু মানছি না আমরা সরকার ও প্রশাসনের কথা। মানছিনা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কথা। কিন্তু কেন?

আপনারা জানেন, বর্তমান সরকারের দেশ পরিচালনায় দেশে এখন গরীবের সংখ্যা অনেকটা কমে এসেছে। বলবনা পথেঘাটে হতদরিদ্র ভিক্ষুক একদম কমে গেছে। আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের রাস্তায়ও কিন্তু ভিক্ষুকের দেখা মিলে। তবে তথ্যমতে, বাংলাদেশে এখন শতকরা ২২% মানুষ গরিব শ্রেণির। এই ২২% গরিব মানুষদের, বাকি ৭৮% মানুষেরা কি মাত্র ১৫টা দিন সরকারের পাশাপাশি চালাতে পারবে না? কোন ব্যাপার এক মাস চালানো। আমাদের সবার পাশের মানুষগুলোর প্রতি একটু মানবিক হোন।

একজন মানুষ না খেয়ে কত দিন বাঁচতে পারে? অনেক মুরুব্বি বলতে শুনেছি ৪০ দিন। তবে এর সঠিক বৈজ্ঞানিক শতভাগ সত্যতা হয়তো নেই। কেননা ইতোমধ্যে এর উদাহরণ পৃথিবীর বুকে অনেক জমা পড়েছে। যেমন-রানার প্লাজার ‘রেশমী’ নামে মেয়েটি ধসে পড়া দালানের নিচে ১৭ দিন পর্যন্ত বেঁচে ছিলো। ২০০৫ সালে পাকিস্তানের কাশ্মীরে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে ‘নকশা বিবি’ ৬৩ দিনের মতো বেঁচে ছিল। তবে সে ছাঁদ থেকে চুষে পড়া হালকা পানির ফোঁটা পেয়েছিলো।

আরো যেমন-ইরানের ৯৭ বছর বয়সি ‘শহরবান’ু নামে এক মহিলা ২০০৪ সালে ভূমিকম্পে দালানের ধংসাবশেষে ৯ দিন বেঁচে ছিলেন। ২০১০ সালে হাইতি ২৭ দিন বেঁচে ছিলো ‘ইভান্স’ নামে এক যুবক। ১৯৯০ সালে ফিলিপাইন দুর্যোগ এর কারণে ‘পেড্রিটো ডাইট’ ১৪ দিন নৌকায় বেঁচে ছিলো ।

এবার আসা যাক, এডওয়ার্ড মাইকেল ‘বিয়ার’ গ্রিলসের কথায়। যাকে সবাই বিয়ার গ্রিলস নামে চিনেন। ব্রিটিশ নাগরিক বড় অভিযাত্রী ও টিভি উপস্থাপক তিনি। ডিসকভারি চ্যানেলে লাইভের কল্যাণে তাকে সবাই চিনে পাহাড় জঙ্গলের মানুষ। এমন খাবার তিনি খান। সাপ বিচ্চু থেকে শুরু করে পোঁকামাকড় পর্যন্ত জীবন্ত গিলে খায়। প্রতিকূল পরিবেশ আর দুর্যোগের সাথে লড়াই করে কিভাবে মানুষকে বাঁচতে হয় সেটাই তিনি দেখিয়ে থাকেন। গ্রিলস বলেন, ‘মানুষ বাতাস ছাড়া ৩ মিনিটি বাঁচতে পারবে। (আপাতত আল্লাহ এটা ঠিক রেখেছে) পানি ছাড়া ৭ থেকে ১০ দিন। (আল্লাহ এটাও আপাতত ঠিক রেখেছে) খাদ্য ছাড়া মানুষ ১৫ দিনের মতো বাঁচতে পারে একেবারে না খেয়ে।

কিন্তু দেশের মানুষের তো এরকম কোন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। দুর্যোগ আর মহামারিতে মানুষ লড়াই করে ত হবে। এটাই নিয়ম। কিন্তু করোনা ভাইরাস তো অন্যরকম মহামারি। এটার চিকিৎসা আপাতত ঘরে থাকা। দুরত্ব বজায় রাখা। ত্রাণের কবলে পড়ে মানুষ কি করোনা ভাইরাসকে ভুলে গেছে। সামনের পরিস্থিতি সুখকর না ভয়াবহ। তা জানি না। দেশে রোগী বাড়ছে, মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। তাহলে কি আমাদের গ্রিলসের ফর্মূলাটা ব্যবহার করতে হবে।

এক দিনের খাবার ৪ দিন খেতে হবে। প্রয়োজনে বের হতে পারব না। ঘরে থাকতে হবে। এ বিপদ কেবল গরীবের জন্য। এই রোগ মহামারিতে ধনী আর মধ্যবিত্তরাও কম কষ্টে নেই। ব্যবসার ক্ষতির মুখে ব্যবসায়িরা। অনেকে ব্যাংক লোনের ভারে দেউলিয় হওয়ার সম্ভাবনা। মনের দিক দিয়ে কেউ শান্তিতে নেই। এরকম দুর্যোগে মানুষ কখনো মুখোমুখি হয়নি। কোনদিন কল্পনা ও করেনি। এখন লড়াই করে সামনে নিশ্চিত বেঁচে থাকাই ‘অন্তত সুখ’।

এবার ধর্মের কথায় বলছি। ইসলাম ধর্মের বিশ্বাসীরা তকদিরে বিশ্বাসী। হাদিসে আছে মানুষ জন্মের ২৫ হাজার বছর আগে তার রিজিক তৈরি করা হয়েছে। রিজিকে যা আছে তা খাবে। কখন কোথায় কি খাবে। সে নিজেও জানে না। তবুও তো চেষ্টা করতে হবে। এটাও ধর্মে বলা আছে। তাই বলে সামনে বিপদ দেখে আগুনে ঝাঁপ দিবো? কুরআন কি বলে। কুরআন বলে যখন তোমাদের বিপদ হবে। তখন দুটো কাজ করবেন। এক. ধৈর্য্য ধরা। দুই. নামায পড়। তাহলে তোমাদের বিপদ শেষ।

সবার উচিত এমন দিনে একটু ধৈর্য্য ধরে পরিস্থিতি অবলোকন করা। ১৫ দিন না খেলে মারা যাবো না। করোনায় আক্রান্ত হলে মরতে পারি। শেষ হতে পারে পুরো পরিবার। সরকার তার সাধ্য মতো চেষ্টা করছে। জনগণকে নিরাপদ স্বাস্থ্যে অটুট রাখতে। আমাদের চেয়ে তেরগুণ শক্তিশালী রাষ্ট্রের কি অবস্থা তাতো দেখতেছেন টিভি আর স্যোশাল মিডিয়ায়।

সরকারের নির্দেশ মানা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। ত্রাণের জন্য ছুটে চলা মানে পতঙ্গের মতো আগুনে ঝাঁপ দেওয়া একই সমান? এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে মনে হয় না। নিজ নিজ সর্তকতাই করোনা প্রতিষেধক ও বেঁচে থাকার ভ্যাকসিন। রাষ্ট্রের আইন মানতে নয়, নিজে ও নিজের পরিবারকে বাঁচাতে ঘরে থাকুন। আপনি ঘরে থাকলেই করোনা দুর্বল হবে। বিশেষ কৃতজ্ঞতা দৈনিক ‘প্রথম আলো’তে প্রকাশিত ডাঃ এবিএম আবদুল্লাহ এর লেখার প্রতি।

লেখক: মুহাম্মদ সেলিম হক
সাংবাদিক ও সমসাময়িক লেখক
প্রতিষ্ঠাতা মুক্তবিহঙ্গ ক্লাব, (কর্ণফুলী) চট্টগ্রাম।

নোট: মতামতের জন্য সম্পাদক নয়, লেখকই দায়ী।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 49 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ