আম্পানের তান্ডবে প্লাবিত সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় দূর্গতদের মধ্যে সুপেয় পানির জন্য চলছে হাহাকার

Print

মোঃ ইমরান সরদার,সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি: দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সুপার সাইক্লোন ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে একের পর এক ভেঙ্গেছে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ। এতে পানিতে ভাসছে উপকূলের শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জসহ কয়েকটি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। নদ-নদীর পানিতে উপদ্রত এলাকার মিষ্টি পানির আধার ডুবে যাওয়ায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

গত ২০ মে, বুধবার কয়েক ঘণ্টার তান্ডবে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরাকে তছনছ করে গেছে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। ঝড়ের প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে কপোতাক্ষ নদ ও খোলপেটুয়া নদীর পানিতে প¬াবিত হয়েছে জেলার সুন্দরবনঘেষা শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী ও কাশিমাড়ি ইউনিয়ন এবং আশাশুনি উপজেলা সদর, প্রতাপনগর, আনুলিয়া ও শ্রীউলা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা। ঘূর্ণিঝড়ের পর আটদিন কেটে গেলেও এখনও ভেঙ্গে যাওয়া অধিকাংশ পাউবো’র বেড়ি বাঁধ মেরামত করা সম্ভব হয়নি। ফলে নদীর লেনা পানিতে গ্রামের পুকুর ও টিউব ওয়েলসহ মিষ্টি পানির আধার গুলো এখনো ডুবে রয়েছে। সেকারনে দুর্গত এলাকায় সুপেয় পানির জন্য হাহাকার পড়ে গেছে।

আশাশুনির শ্রীউলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হেনা সাকিল জানান, বানভাসি মানুষের মাঝে সুপেয় খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্র, বেড়িবাঁধসহ আশাশুনি- ঘোলা সড়কের উপরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়েছে। তার ইউনিয়নের হাজরাখালী, মাড়িয়ালা, কলিমাখালী, লাঙ্গলদাড়িয়া গ্রামের বানভাসি মানুষ চরম দুর্দিনের মধ্যে রয়েছে। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডাঃ আ ফ ম রুহুল হক এর নির্দেশে বানভাসী মানুষের জন্য সুপেয় পানি সরাবরাহ করছে আশাশুনি উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে মেডিকেল টিমের সদস্যরা।

জেলার উপকূলীয় গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম জানান, কপোতাক্ষ নদ ও খোলপেটুয়া নদীর লোনা পানিতে তার ইউনিয়নের গ্রামের পর গ্রাম প্লবিত। বিধ্বস্থ হয়েছে অসংখ্য কাঁচা ঘরবাড়ি। স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। পাতা-লতা ও আবর্জনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে পানি। এলাকায় দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। পানির জন্য হাহাকার চলছে উপকূলজুড়ে। চারিদিকে পানি থৈ থৈ অথচ খাবার পানি নেই। নেই রান্নার পানি, গোসলের পানি। কয়েকটি সংগঠনের পক্ষ থেকে খাবার পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হলেও কয়েক মাইল পথ পায়ে হেটে গিয়ে লম্বা লাইনে দাড়িয়ে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের।

জেলা পরিষদের সদস্য আনুলিয়া ইউনিয়নের বিছট গ্রামের আব্দুল হাকিম মোড়ল জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে বিছট গ্রামের বেড়িবাঁধের তিনটি পয়েন্ট ভেঙ্গে যায়। এতে করে প্লাবিত হয়ে পড়ে পুরো গ্রাম। নদীর লোনা পানিতে গ্রামের সব গুলো পুকুর তলিয়ে গেছে। ফলে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এই গ্রামের মানুষের। প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পায়ে হেটে পাশের গ্রাম থেকে প্লাবিত গ্রামবাসীদের খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অনেকে ব্যক্তিগত ভাবে নতুন টিউব ওয়েল বসালোও তার পানি খাবার উপযোগি হচ্ছে না। ফলে এই গ্রামের দূর্গত মানুষের মধ্যে চলছে তীব্র খাবার পানির সংকট। তিনি দ্রুত গ্রামবাসীদের জন্য সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যবস্থার দাবি জানান।

প্রতাপনগর ইউনিয়নের মেম্বর চাকলা গ্রামের গোলাম রসুল জানান, বেশ কয়েকটি স্থানে কপোতাক্ষের বাঁধ ভেঙ্গে পুরো চাকলা গ্রাম নোনা পানিতে তলিয়ে গেছে। এই গ্রামের মানুষ বেড়িবাঁধসহ উচু স্থানে আশ্রয় নিলেও গ্রাম জুড়ে চলছে তীব্র খাবার পানির সংকট। সারা গ্রামের কোথাও এতটুকু খাবার পানির ব্যবস্থা নেই। ইতিমধ্যে এই গ্রামের অনেকেই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন।প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ জাকির হোসেন জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে তার ইউনিয়নের কোলা, হরিষখালী, কুড়িকাউনিয়া ও চাকলাসহ একাধিক স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে প্রায় পুরো ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ সংষ্কার করা সম্ভব না হওয়ায় এখনো প্লাবিত এলকায় নিয়মিত জোয়ার ভাটা চলছে। ফলে এসব এলাকায় বসবাসকারিদের মধ্যে খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ইতিমেধ্য চালকলাসহ কয়েকটি এলাকায় বানভাসি মানুষ পানি বাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হতে শুরু করেছেন। এই মুহুর্ত্বে ত্রাণের পাশাপাশি দূর্গতদের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করা অত্যান্ত দূরহ ব্যপার হয়ে দাড়িয়েছে।

শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় সুপেয় পানির ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। এই মহূতে খাবার পানির জন্য দূর্গত এলাকার মানুষ রাস্তায় লাইন ধরে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছে। স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন লিডার্স উপদ্রুত মানুয়ের জন্য যে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছে প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই নগণ্য।

সাতক্ষীরা ৪ আসনের সাবেক সংসদ গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, উপকুলীয় এলাকা ও শ্যামনগরের দ্বীপ গাবুরাও গোলাখালীতে স্থায়ী টেকসই বেড়িবাধ নির্মান ও সুপেয়ু ব্যবস্থা না হলে দ্বীপ এলাকায় জনবসতী কমে যাবে । সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার কর্মীজীবি মানুষ কর্মীহীন হয়ে পড়বে । এলাকায় বেকারত্ব সংখ্যা বাড়বে। সাতক্ষীরা জেলায় প্রতি বছর বিভিন্ন এলকায় নদ ও নদীতে অতিরিক্ত জোয়ারের তোড়ে , জলোচ্ছাসও বিভিন্ন সময়ে ঘূণীঝড়ে বেড়িবাধ ভেঙ্গে বির্স্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয় । অনেক সময় জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে । এর থেকে পরিত্রান পেতে দরকার স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাধ নির্মান ও সুপেযূর পানির ব্যবস্থা । উপকুলীয় এলাকার মানুষ তারা ত্রান চায় না চায় টেকসই বেড়িবাধ নির্মান ও সুপেয়ুর ব্যবস্থা।

এলাকায় এদিকে বসরকারী উন্নয়ন সংগঠন লিডার্স ঘূর্ণিঝড় আম্ফান রেসপন্স কার্যক্রমের আওতায় যে সকল এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে অবস্থান করছেন তাদের মাঝে গত ২৪ মে থেকে সুপেয় পানি বিতরন কার্যক্রম শুরু করেছে। লিডার্স দূর্গত এলাকায় দৈনিক ৮০০০ লিটার সুপেয় পানি বিতরণ করছে। সংগঠনটি সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি এবং খুলনা জেলার কয়রা উপজেলায় তাদের এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে।

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 99 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ