জিপিএ ফাইভ পাইনি বলেই কি আমি একজন ব্যর্থ মানুষ!

Print

জিপিএ ফাইভ পাইনি বলেই কি আমি একজন ব্যর্থ মানুষ!
লুৎফর রহমান রিটন

এসএসসি-র রেজাল্ট বেরিয়েছে। অভিভাবকদের একটা দলের উচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছে ফেসবুক। তাঁদের পুত্রকন্যারা জিপিএ ফাইভ পেয়েছে। সন্তানের পর্বতপ্রমাণ সাফল্যে তাঁদের ঘরে ঘরে ঈদের খুশি। অভিভাবকদের আরেকটা দলের খুব মন খারাপ। তাঁরা তাঁদের ফেসবুক আইডি ডিএক্টিভ করে রেখেছেন। তাঁদের পুত্রকন্যারা জিপিএ ফাইভ নামের রয়েল বেঙ্গল টাইগারটাকে খাঁচায় বন্দী করে বাড়িতে নিয়ে আসতে পারেনি। এখন সমাজে মুখ দেখাবেন কী করে! হাহ হাহ হাহ।

আমার যে বন্ধুরা এবার জিপিএ ফাইভ পাওনি তাদের সব্বার জন্যে অনেক অনেক শুভ কামনা। আর যে বন্ধুরা পেয়েছো তাদের জন্যেও শুভ কামনা সমান মাপের। পাওয়া এবং না পাওয়া বন্ধুদের বলছি–জীবনে জিপিএ ফাইভ এমন কোনো বিশাল বা মহৎ অর্জন নয়। দেশ-বিদেশের বড় বড় মানুষেরা, তোমার চারপাশের সফল এবং বিখ্যাত মানুষেরা কেউ জিপিএ ফাইভ পায়নি। জিপিএ ফাইভ একটা ধারণার সার্টিফিকেট মাত্র। তুমি যদি ভালো মানুষ না হও, মানবিক মানুষ না হও, দেশপ্রেমিক না হও তাহলে সেই সার্টিফিকেটের কোনোই দামই নেই কিন্তু!

আর যে বন্ধুরা পাশ করতে পারো নি তাদের জন্যেও আমার একই মাপের শুভকামনা। এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীরাও কিন্তু পরবর্তী জীবনে অনেক বড় কিছু করে দেখিয়েছে।
ফেল করা মানেই জীবনটা ব্যর্থ হয়ে যাওয়া নয়।
পাশ করে যাওয়া তোমার বন্ধুটি একজন বিদ্যাসাগরও নয়। কোনো না কোনো ক্ষেত্রে তুমি তার চেয়েও অনেক ভালো জানো এবং বোঝো। এবং শেষমেশ প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেটের বাইরের পৃথিবীটা অনেক অনেক বড় এবং সুন্দর। অনেক রঙিন এবং বর্ণাঢ্য। তোমাকে যোগ্য হয়ে উঠতে হবে সেই পৃথিবীতে।

আমি আসলে জিপিএ ফাইভ নামের এই সিস্টেমটারই সমর্থক নই। আমার মতে এই সিস্টেমটা আমাদের শিশুদের মনোজগতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
কয়েক মাস আগে জিপিএ ফাইভ বিষয়ে একটা ছড়া লিখেছিলাম। এবারের বইমেলার শেষ দিনে ছড়াটা বই হয়ে বেরিয়েছিলো ‘খুশবু’ নামের নতুন একটি প্রকাশনা সংস্থা থেকে।
ছড়াটা এখানে তুলে ধরছি ফেসবুকে বাকুম বাকুম করা কিংবা আইডি ডিএক্টিভ করা অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে।
আমার শিক্ষার্থী বন্ধুদের জন্যে তো বটেই।
………………………………………………

জিপিএ ফাইভ ছড়া
লুৎফর রহমান রিটন

তুমি একটা জিপিএ ফাইভ সোনার টুকরো ছেলে
পরীক্ষাতে সবাইকে দাও ঠিক পেছনে ফেলে।

কেউ পারে না তোমার সাথে
কারণ তুমি দিনে রাতে–
আটকে থাকো কেবল পড়ায়
দিন চলে যায় রাতটা গড়ায়
যাও না মাঠে হয় না খেলা
কোচিং করো বিকেল বেলা
ব্যস্ত ভীষণ ব্যস্ত ভীষণ
না পত্রিকা-টেলিভিশন
হয় না পড়া গল্প-ছড়া
কী বোর্ড-বাঁশি হয় না ধরা
হয় না কোথাও একটু যাওয়া
মুক্ত বাতাস হয় না খাওয়া
কাঁধে বইয়ের ব্যাগটা ভরা
পড়া পড়া কেবল পড়া
খুব ব্রিলিয়ান্ট বিদ্যাসাগর নও তো এলেবেলে।
তুমি একটা জিপিএ ফাইভ সোনার টুকরো ছেলে!

খাওয়া দাওয়ায় নেইকো রুচি
খুব বেশি চাপ পাঠ্য-সূচি
দেয় না সুযোগ একটুখানি
নোট-গাইডের টানছো ঘানি
না গান গাও ছবি আঁকো
চার দেয়ালেই বন্দি থাকো
ছকের বাইরে মোটেও যাও না
তাইতো তুমি দেখতে পাও না
প্রজাপতি নাচছে কেমন রঙিন পাখা মেলে।
তুমি একটা জিপিএ ফাইভ সোনার টুকরো ছেলে!

যাও না তুমি নদীর কাছে
নদীর কতো গল্প আছে!
মাছের সাথে কও না কথা
ঘাসফুল আর ঝুমকো লতা
কেমন করে হাসে নাচে
সকাল বেলার রোদের আঁচে
কেমনে বাঁচে শিশিরকণা
দুর্বাগুলো কী আনমনা!
রাতের আকাশ চাঁদ দেখো না
চাঁদের হাসির বাঁধ দেখো না
তারার সাথেও নেই পরিচয়
মেঘ-শিশুদের ঝগড়া কি হয়!
জোৎস্না রাতের স্নিগ্ধ আলো
রূপোর মতো কী জমকালো
তোমার তো নেই কিছুই জানা–
কুকুর কিংবা বেড়াল ছানা
কেমন করে ডিগবাজি খায়
লাফায় ঝাঁপায় লেজটা নাচায়।
হরিণ ছানার লুটোপুটি।
কাঠবেড়ালির হুটোপুটি
লেজ উঁচিয়ে চুটুর পুটুর
বাদাম খোঁজে গুটুর মুটুর
খরগোশদের গাজর প্রীতি
ইঁদুরগুলোর বেড়াল ভীতি
কী হয় আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে
কেমন করে ফড়িং হাসে
কোথায় পালায় জোনাকিরা জোনাক-বাতি জ্বেলে?
তুমি একটা জিপিএ ফাইভ সোনার টুকরো ছেলে!

টুনটুনিটার মিষ্টি গানে
গান আসে না তোমার প্রাণে
মুখস্থ সব বিদ্যা তোমার
হেমিংওয়ে কিংবা হোমার
রঙ লাগে না তোমার মনে
গ্রিম ব্রাদার্স ও এন্ডারসনে
ভাল্লাগে না পরিবেশন
ফেইরি টেলস্‌ বা এনিমেশন
ঘুরতে চাও না ইস্টিমারে
সত্যজিৎ বা সুকুমারে
আগ্রহ নেই একটুখানি
আমি জানি আমি জানি…

তোমার শুধু নিষেধ বারণ
কারণ? কারণ? কারণ? কারণ–

তুমি একটা সোনার টুকরো
বৃহষ্পতি শনি শুক্র
রোজ প্রতিদিন ঘড়ি ধরে
কোচিং কোচিং কোচিং করে
বাড়ি ফেরো ক্লান্ত হয়ে খুব বিষণ্ণ তুমি
পাওনি কোনো স্বপ্ন দেখার টুঙটুঙা ঝুমঝুমি।

পাওয়ার মধ্যে শুধুই একটা ‘সাট্টিফিকেট’ পেলে!
তুমি একটা জিপিএ ফাইভ সোনার টুকরো ছেলে।
রচলাকাল/ অটোয়া ০৫ জানুয়ারি ২০২০

[আলোকচিত্র/ সাবরিনা নদী।]

[ প্রিয় পাঠক, আপনিও বিডিসারাদিন24 ডট কম অনলাইনের অংশ হয়ে উঠুন। লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ, ক্যারিয়ার, পরামর্শ, রান্নার রেসিপি, ফ্যাশন-রূপচর্চা ও ঘরোয়া টিপস নিয়ে লিখুন এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছবিসহ মেইল করুন- bdsaradin@gmail.com-এ ঠিকানায়। লেখা আপনার নামে প্রকাশ করা হবে। নারীকন্ঠ এবং মত-দ্বিমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে  bdsaradin24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না। ]

প্রতি মুহুর্তের সর্বশেষ খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন

(লেখাটি পড়া হয়েছে 125 বার)


Print
এই পাতার আরও সংবাদ