একমি ল্যাবরেটরিজের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রতিষ্ঠাতা হামিদুর রহমান সিনহা: একটি স্বপ্ন, একটি পরিবার, একটি ইতিহাস
বাংলাদেশের শিল্প ও ওষুধশিল্পের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের দূরদর্শিতা, সততা, কর্মনিষ্ঠা এবং সাহস একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। তাঁদেরই অন্যতম শ্রী হামিদুর রহমান সিনহা (১৯১৪–১৯৯৪)। তিনি শুধু একজন সফল শিল্পপতি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা উদ্যোক্তা, একজন মানবিক নেতা এবং বাংলাদেশের আধুনিক ওষুধশিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা The ACME Laboratories Ltd. আজ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি গুণগত মান, আস্থা, সততা এবং মানুষের সেবার এক অনন্য প্রতীক।
১৯১৪ সালে বিক্রমপুর তথা মুন্সিগজ্ঞ জেলার লৌহজং উপজেলায় কলমা ইউনিয়নে জন্মগ্রহণকারী হামিদুর রহমান সিনহা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনের প্রকৃত সাফল্য আসে সততা, কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা থেকে। এই আদর্শই তাঁকে পরবর্তীকালে একজন অসাধারণ উদ্যোক্তা ও সফল শিল্পপতিতে পরিণত করে।
১৯৩২ সালে তিনি তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার অন্যতম বাঙালি পাট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান মেসার্স ম্যাকেরটিচ অ্যান্ড কোং-এর অংশীদার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ব্যবসায়িক জীবনের শুরু থেকেই তিনি দক্ষতা, সততা এবং বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। পরে ১৯৪০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান মেসার্স এন. এল. রায় অ্যান্ড কোং-এ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে তিনি ইন্ডিয়া সিকিউরিটি ব্যাংক লিমিটেড-এর প্রোমোটার-পরিচালক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সুদূরপ্রসারী করে তোলে।
একটি স্বপ্নের সূচনা
১৯৫৪ সালে হামিদুর রহমান সিনহা এমন এক স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা সে সময় অনেকের কাছেই অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ উৎপাদন সম্ভব। সেই বিশ্বাস থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন The ACME Laboratories।
শুরুর দিনগুলো ছিল অত্যন্ত কঠিন। সীমিত পুঁজি, সীমিত প্রযুক্তি, দক্ষ জনবলের অভাব এবং নানামুখী প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল মানুষের জন্য নিরাপদ, কার্যকর এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদন করা। তিনি কখনো গুণগত মানের সঙ্গে আপস করেননি। এই আপসহীন নীতিই ধীরে ধীরে ACME-কে মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত করে।
১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। এরপর হামিদুর রহমান সিনহার দূরদর্শী নেতৃত্বে ACME গবেষণা, উৎপাদন, প্রযুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রণে একের পর এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করে। ১৯৮৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হন এবং তাঁর নেতৃত্বেই ACME বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
নীরব অনুপ্রেরণা—নূরজাহান সিনহা
প্রতিটি সফল মানুষের পেছনে একজন নীরব অনুপ্রেরণার মানুষ থাকেন। হামিদুর রহমান সিনহার জীবনে সেই মানুষটি ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী শ্রীমতি নূরজাহান সিনহা (১৯২৭–১৯৬৫)। তিনি শুধু একজন জীবনসঙ্গী ছিলেন না; ছিলেন তাঁর সাহস, শক্তি এবং আত্মবিশ্বাসের উৎস।
ব্যবসার প্রতিটি কঠিন সময়ে তিনি স্বামীকে মানসিক শক্তি, আত্মত্যাগ এবং অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন। ACME পরিবারের মতে, নূরজাহান সিনহার ত্যাগ, ধৈর্য এবং উৎসাহ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের আজকের অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হতো না। তাই ACME-এর ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।
পরিবার—যেখানে উত্তরাধিকার হয়ে বেঁচে আছে একটি স্বপ্ন
হামিদুর রহমান সিনহা শুধু একজন শিল্পপতি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন আদর্শ পারিবারিক অভিভাবকও। তিনি তাঁর সন্তানদের মধ্যে সততা, পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা দিয়েছিলেন।
তাঁর চার পুত্র ও দুই কন্যা ছিলেন।
জ্যেষ্ঠ পুত্র নাসির-উর রহমান সিনহা দীর্ঘদিন The ACME Laboratories-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর চার পুত্রের মধ্যে রয়েছেন আনসার উদ্দিন সিনহা, রেজা-উর রহমান সিনহা, মতিউর রহমান সিনহা এবং আরও একজন পুত্র, যার নাম এখানে উল্লেখ করা হয়নি।
দ্বিতীয় পুত্র মিজানুর রহমান সিনহা ছিলেন The ACME Laboratories-এর দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশের সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে ACME আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে। তাঁর দুই সন্তান হলেন তানভীর সিনহা সুপ্রিয় এবং তাসনিম সিনহা (স্নিগ্ধা)।
বর্তমানে তানভীর সিনহা সুপ্রিয় The ACME Laboratories Ltd.-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (Managing Director) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক মান এবং বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাতার স্বপ্নকে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
তৃতীয় পুত্র আফজালুর রহমান সিনহা ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সফল শিল্পপতি এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সুপরিচিত সংগঠক। তিনি ACME Group-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দুই সন্তান সাবরিনা সিনহা এবং ফাহিম সিনহা। ফাহিম সিনহা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কনিষ্ঠ পুত্র ড. জাবিলুর রহমান সিনহা একজন বিজ্ঞানী ও শিল্প উদ্যোক্তা। গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে তিনি ACME-এর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁর দুই কন্যা সিলভানা সিনহা এবং তানিয়া কাদের সিনহা। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বা সাকা চৌধুরী ছিলেন তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়। তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন মূলত সাকা চৌধুরীর বোনের সাথে অর্থাৎ তার দুই মেয়ে সিলভানা সিনহা ও তানিয়া কাদের সিনহা মূলত সাকা চৌধুরীর আপন দুই ভাগনে!!
হামিদুর রহমান সিনহার দুই কন্যাও এই বৃহৎ পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাঁদের পরিবারসহ পরবর্তী প্রজন্ম ব্যবসা, শিক্ষা, সমাজসেবা এবং বিভিন্ন জাতীয় কর্মকাণ্ডে অবদান রেখে প্রতিষ্ঠাতার আদর্শকে ধারণ করে চলেছেন।
একজন মহান নেতার দর্শন
হামিদুর রহমান সিনহা বিশ্বাস করতেন, “একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি তার ভবন বা মূলধনে নয়; বরং তার মানুষের সততা, কর্মদক্ষতা এবং জনগণের বিশ্বাসে।”
এই দর্শনকে সামনে রেখেই তিনি একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে গুণগত মান, গবেষণা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নৈতিক ব্যবসাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অমর উত্তরাধিকার
১৯৯৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি হামিদুর রহমান সিনহা ইহলোক ত্যাগ করেন। কিন্তু একজন স্বপ্নদ্রষ্টার মৃত্যু তাঁর স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারে না। আজও ACME-এর প্রতিটি সাফল্যে তাঁর চিন্তা, তাঁর আদর্শ এবং তাঁর দূরদর্শিতার প্রতিফলন দেখা যায়।
আজ ACME Group শুধু বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীই নয়; এটি দেশের মানুষের আস্থা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনামের প্রতীক। হাজারো কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরিশ্রম এবং প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের ধারাবাহিক নেতৃত্বে তাঁর স্বপ্ন প্রতিনিয়ত আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
হামিদুর রহমান সিনহা আমাদের শিখিয়ে গেছেন—সত্যিকারের সাফল্য শুধু একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় নয়; বরং এমন একটি আদর্শ রেখে যাওয়ায়, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।
আজ তাঁর সন্তান, নাতি-নাতনি এবং উত্তরসূরিরা সেই স্বপ্নের প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন। তাঁদের হাত ধরেই ACME নতুন নতুন সাফল্যের পথে এগিয়ে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়নের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করছে।
শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করি বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের মহান স্থপতি, স্বপ্নদ্রষ্টা শিল্পপতি এবং The ACME Laboratories Ltd.-এর প্রতিষ্ঠাতা শ্রী হামিদুর রহমান সিনহাকে। তাঁর কর্ম, আদর্শ ও অবদান আগামী প্রজন্মের জন্য চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন