পাকিস্তান-বাংলাদেশ জাহাজ চলাচল : ইতিহাসে টার্নিং পয়েন্ট? | bdsaradin24.com
বিশেষ প্রতিনিধি
১৭ নভেম্বর ২০২৪, ৬:৪৩ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

পাকিস্তান-বাংলাদেশ জাহাজ চলাচল : ইতিহাসে টার্নিং পয়েন্ট?

পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী করাচি থেকে গত সপ্তাহে একটি পণ্যবাহী জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। ১৯৭১ সালের পর এটিই প্রথম কোনও পাকিস্তানি পণ্যবাহী জাহাজের বাংলাদেশে নোঙর করার ঘটনা।

পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম সরাসরি সামুদ্রিক যোগাযোগকে ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তান হাইকমিশন “দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বড় পদক্ষেপ” হিসাবে বর্ণনা করেছে। আর এই ঘটনাটি দুই দেশের মধ্যে “ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল সম্পর্কের” ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।

তবে চলতি বছরের আগস্টে গণবিপ্লবের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর থেকেই এই পরিবর্তন শুরু হয়েছে। শুক্রবার (১৫ নভেম্বর) রাতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে এমনটাই জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

হাসিনা, পাকিস্তান ও ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঢাকার কিছু সরকারের অধীনে তিক্ত হয়েছে, বিশেষ করে শেখ হাসিনার অধীনে। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন (১৯৯৬-২০০১, ২০০৯-২০২৪) তিনি ১৯৭১ সালে “যুদ্ধাপরাধের দায়ে” “সহযোগী” বা রাজাকারদের নির্মমভাবে বিচার করেছিলেন।

তিনি “যুদ্ধাপরাধীদের” বিচারের জন্য ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেন এবং ২০১৩ সালে এই ট্রাইব্যুনাল জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করে। হাসিনার শাসনামলে ফাঁসি কার্যকর হওয়া অনেক বিরোধী নেতার মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রথম।

আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডকে পাকিস্তানের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খান খুবই দুর্ভাগ্যজনক বলে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “এতে কোনও সন্দেহ নেই যে— ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের প্রতি তার আনুগত্য এবং সংহতির কারণে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে”।

একইসঙ্গে হাসিনা বাংলাদেশকে ভারতের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিলেন। হাসিনা নিজেই নেহেরু-গান্ধী পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক রাখতেন এবং ১৯৭৫ সালে তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তাকে নয়াদিল্লিতে আশ্রয়ও দেওয়া হয়েছিল।

পাকিস্তানের জন্য নতুন সূচনা

সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের দাবি, গত আগস্টে ছাত্র-জনতার ব্যাপক গণআন্দোলনে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় আশপাশে ঘটা তিনটি ঘটনা এখন যা ঘটছে সেই প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য।

প্রথমত, হাসিনা দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তার দল ও পরিবারের অবদান থেকে রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছেন। কিন্তু ছাত্রদের বিক্ষোভ যেমন সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে— বিক্ষোভ ও প্রতিবাদকারীদের রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত করার কৌশল কোনও কাজই করেনি।

দ্বিতীয়ত, নয়াদিল্লির সঙ্গে হাসিনার “অতি ঘনিষ্ঠ” সম্পর্কের জন্য বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভও ছিল। অনেকে মনে করতেন, বাংলাদেশের বিষয়ে ভারত খুব বেশি করে জড়িয়ে পড়ছে এবং হাসিনার প্রতি প্রকাশিত ক্ষোভকে “ভারত-বিরোধী” মনোভাব হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, গত আগস্ট মাসে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজধানীতে চালু থাকা ভারতীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে (আইজিসিসি) ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ জনতা।

তৃতীয়ত, সংখ্যালঘু নিয়ে বাংলাদেশে সর্বদাই একটি আখ্যান বা বর্ণনা বিরাজমান আছে। আর সেটি ১৯৭১ সালের ঘটনাকে মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে নয় বরং মুসলিম জাতির ট্র্যাজেডি এবং দেশভাগের প্রতিশ্রুতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। ঢাকায় হাসিনা-পরবর্তী সরকার ব্যবস্থায় ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে।

আর এই সব বিষয়ই বাংলাদেশের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ হাত প্রসারিত করার জন্য পাকিস্তানের পক্ষে আদর্শ পরিস্থিতি গড়ে তুলেছে। শেখ হাসিনার ঢাকা থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার পরের মাসগুলোতে একাধিক পাকিস্তানি সম্পাদকীয় ও মতামত-প্রবন্ধগুলোতে এই বিষয়টি উল্লেখও করা হয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি কূটনীতিক বুরহানুল ইসলাম নিউজ পোর্টাল প্যারাডিজম শিফটে লিখেছেন, “স্পষ্টতই এখন সময় এসেছে বাঙালি এবং বাংলাদেশের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার… ১৯৭১ সালের তিক্ত অনুভূতিগুলোকে সরিয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয়েরই তাদের সম্পর্ক পুনর্গঠন করা উচিত।”

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারও এখন পর্যন্ত ইসলামাবাদের বিভিন্ন প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সাথে বৈঠক করেন।

ওই বৈঠকে উভয় নেতা দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা পুনরুজ্জীবিত করার এবং উভয় দেশের সম্পর্কের “নতুন পৃষ্ঠা” চালু করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এনসিপি-জামায়াত জোটে ভাঙনের গুঞ্জন

একমি ল্যাবরেটরিজের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রতিষ্ঠাতা হামিদুর রহমান সিনহা

মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলে যেসব সমস্যা হতে পারে

মির্জা ফখরুলই হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি

বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪ টুথপেস্টের ২৬টিতেই মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক

১৮ জনের মধ্যে ১২ রাষ্ট্রপতিই মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।

সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগপত্রঃ একটি জটিল এবং ধূর্ত মনস্তাত্ত্বিক দলিল!?

নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন কীভাবে

ফার্মেসী ব্যবসার জন্যে লাইসেন্সসহ যা যা লাগবে

নতুন ফার্মেসি ব্যবসার প্রথম ধাপ: কীভাবে করবেন ড্রাগ লাইসেন্স?

১০

পঞ্চদশ সংশোধনী: কেন এসেছিল, কী বদলেছিল, কেন আবার আলোচনায়?

১১

ইতিহাস ও নিসর্গের অপূর্ব মেলবন্ধন ‘বলধা গার্ডেন’

১২

যে পিৎজা বাঁচাল একটি প্রাণ: ডমিনোজের কর্মীদের ছোট্ট মানবিকতার বড় গল্প

১৩

বন্যা ও পানিতে ডুবে মৃতদের দাফনের নিয়ম

১৪

সোনালী অতীতের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র: সিরাজুল ইসলাম ও রানী সরকার

১৫

হালান্ডকে নিয়ে অজানা কিছু কথা

১৬

হলান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিলকে কাঁদিয়ে শেষ আটে নরওয়ে

১৭

মুক্তচিন্তার পথিক: মুস্তাফা মনোয়ার

১৮

পাসপোর্ট এল কেমন করে

১৯

পাসপোর্টের কোন রং দিয়ে কী বোঝায়

২০