মুক্তিযুদ্ধের অজানা নায়িকা: ১৬ বছরের কিশোরী থেকে ৩৫০ নারী যোদ্ধার একমাত্র কমান্ডার আশালতা বৈদ্য
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া থেকে রণাঙ্গনে—একটি ১৬ বছরের মেয়ের অসম্ভব সাহসের গল্প
১৯৭১। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া। এসএসসি পরীক্ষার্থী আশালতা বৈদ্য তখন মাত্র ১৬। বাড়িতে হঠাৎ একদিন রাজাকারদের চিঠি—“আপনার দুই মেয়েকে পাকবাহিনীর কাছে তুলে দিন, নয়তো পাঁচ লাখ টাকা।” বাবা হরিপদ বৈদ্য ও মা সরলাময়ী ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দিনও ঠিক হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু সোমবার রাতে সব বদলে গেল। হেমায়েত বাহিনীর প্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত উদ্দিন এসে দাঁড়ালেন বাড়ির উঠোনে। বললেন, “মাস্টার বাবু, ছেলে হোক আর মেয়ে হোক—একজনকে মুক্তিযুদ্ধে দিতে হবে।” পেছন থেকে আশালতা চিৎকার করে উঠলেন, “বাবা, আমি যাবো!”
হেমায়েত উদ্দিন হেসে বললেন, “এই তো পেয়ে গেছি।” বাবা হরিপদ আর আপত্তি করলেন না। শুধু বললেন, “ও নিজে যেতে চাইলে আমি বাধা দেব না। দেশের জন্য ওকে আমি উৎসর্গ করলাম।”
৪৫ জন মেয়েকে নিয়ে গড়ে উঠল একটি সশস্ত্র নারী গেরিলা দল
পরদিন সকাল। আশালতা ৪৫ জন সহপাঠী ও প্রতিবেশী মেয়েকে নিয়ে হাজির হলেন লাটেঙ্গা লেবুবাড়ী সরকারি প্রাথমিক স্কুলে। হেমায়েত উদ্দিনের ডাকে সবাই স্বেচ্ছায় এসেছিলেন। সেখান থেকেই শুরু হলো ইতিহাস। ৮ ও ৯ নম্বর সেক্টরের কোটালীপাড়া সীমান্ত সাব-সেক্টরে হেমায়েত বাহিনীর মহিলা বাহিনীতে যোগ দিলেন আশালতা। মাত্র ৩৫০ জন নারী মুক্তিযোদ্ধার একমাত্র কমান্ডার হয়ে উঠলেন তিনি।
বরিশালের হেরেকান্দি হাইস্কুল ও লেবুবাড়ী প্রাইমারি স্কুলে হেমায়েত বাহিনীর তত্ত্বাবধানে চলল সামরিক প্রশিক্ষণ। অস্ত্র চালনা, যুদ্ধকৌশল—সবকিছুতে আশালতা ছিলেন ‘ফাস্ট’। স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণেই তিনি হয়ে উঠলেন অসাধারণ দক্ষ।
কমান্ডো বাহিনী গড়লেন, সুইসাইড স্কোয়াডের প্রস্তুতি নিলেন
তাঁর অসীম সাহস দেখে হেমায়েত উদ্দিন ২৪ জন নারী নিয়ে আলাদা একটি নারী কমান্ডো ইউনিট গঠন করলেন। নেতৃত্বে আশালতা। কাজ ছিল শত্রুর অবস্থান রেকি, ছদ্মবেশে গেরিলা হামলা এবং প্রয়োজনে সুইসাইড স্কোয়াড হিসেবে আত্মদানের প্রস্তুতি। প্রত্যেকেই ছিলেন সদা প্রস্তুত।
তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪৫ জনের সশস্ত্র নারী গেরিলা দলকে। অংশ নিয়েছেন কলাবাড়ি যুদ্ধ, হরিনাহাটি যুদ্ধ, রামশীল পয়সার হাট যুদ্ধসহ আরও অনেক ছোট-বড় অভিযানে। রামশীল নদীর পাড়ে একদিন লঞ্চে করে রাজাকার-পাকবাহিনী এলে তাঁর নেতৃত্বে ৩ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলেছিল যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের জয় হয়েছিল সেদিন। গোপালগঞ্জে মোট ২২টি বড় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন আশালতা বৈদ্য। শুধু যুদ্ধ নয়, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের নিজ হাতে সেবা করেছেন তিনি।
স্বাধীনতার পরও থামেননি
স্বাধীনতার পর তাঁর দল শরণার্থীদের বাড়ি ফিরিয়ে দিয়েছে। আশালতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করেন। ১৯৮০-এর দশকে নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে গড়ে তোলেন ‘সূর্যমুখী সংস্থা’। বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবসময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ২০০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিলেন।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় উপাধি পাননি। আজও তেমন কেউ চেনে না তাঁকে।
ইতিহাসের খোঁজে গিরিধর দে’র সৌজন্যে
আশালতা বৈদ্যের এই গল্প বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। ১৬ বছরের এক কিশোরী যখন দেশমাতৃকার সম্মান রক্ষায় অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন, তখন তিনি শুধু নিজের পরিবার নয়—পুরো জাতির মেয়েদের জন্য এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
এই নায়িকাকে আমরা কবে চিনব? কবে তাঁর নাম স্কুলের পাঠ্যবইয়ে, রাজপথের নামপত্তে উঠবে? সময় এসেছে—আশালতা বৈদ্যকে তার প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার।
(সূত্র: গিরিধর দে / বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র)
মন্তব্য করুন