“এই সত্যি কথাগুলো আমি লিখেছি শুধুমাত্র কিশোরী, তরুণী এবং তাদের অভিভাবকদের জন্যে। এত ব্যক্তিগত ঘটনা লিখেছি, কারণ আর কোনো মেয়ে যেন আমার মতো ভুল না করে।”
দীর্ঘদিনের জমানো কষ্ট আর নীরবতা ভেঙে এভাবেই নিজের জীবনের এক চরম তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরেছেন স্বনামধন্য কবি ও হুমায়ূন আহমেদের প্রাক্তন স্ত্রী গুলতেকিন খান। মাত্র ১০ মিনিটের লেখাটি শেষ করতে তাঁর সময় লেগেছে টানা দুই দিন! কারণ, লিখতে গিয়ে বারবার চোখের জলে ঝাপসা হয়ে আসছিল দৃষ্টি।
কী এমন ঘটেছিল গুলতেকিনের জীবনে, যা আজ এত বছর পর তরুণীদের সতর্ক করার জন্য তাঁকে প্রকাশ্যে আনতে হলো?
ঘটনাটি আমেরিকার। হুমায়ূন আহমেদ তখন নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছেন। পড়াশোনার ভীষণ চাপ, একটি পরীক্ষায় বারবার কাঙ্ক্ষিত নম্বর না পাওয়ায় তাঁর মেজাজ থাকত খিটখিটে। আর সেই রাগের শিকার হতে হতো সদ্য বিবাহিতা, আনকোরা তরুণী গুলতেকিনকে।
ডিসেম্বর মাসের এক হাড়কাঁপানো শীতের সন্ধ্যা। কোনো কারণ ছাড়াই হুমায়ূন রেগে গিয়ে গুলতেকিনকে বললেন, “বাসা থেকে বের হয়ে যাও!” গুলতেকিন কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাব?” উত্তরে কোনো মায়া তো মিললই না, উল্টো ধাক্কা দিয়ে তাঁকে বাইরে বের করে ভেতর থেকে দরজা আটকে দিলেন হুমায়ূন!
তখন বাইরে প্রচণ্ড ঠান্ডা, বরফ জমা শীত। আর গুলতেকিনের গায়ে শুধু একটি শার্ট, প্যান্ট আর পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল! দরজায় ধাক্কা দিয়ে, কলিংবেল বাজিয়েও কোনো সাড়া পেলেন না। ঠান্ডায় হাত-পা জমে যাওয়ার উপক্রম হলে তিনি দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নেন কাছের এক মসলার দোকানে। সেখান থেকে এক পরিচিত বন্ধুকে ফোন করে সেই রাতটি পার করেন।
পরদিন সকালে বন্ধুরা যখন লয়ারের সাথে কথা বলে ডিভোর্সের পরামর্শ দেয়, তখন ভয়ে আঁতকে উঠেছিলেন সেই বোকা মেয়েটি। বলেছিলেন, “না না, ও আমাকে অনেক ভালোবাসে। রাগের মাথায় করেছে।”
পরদিন বাসায় ফিরে মেয়ে নোভাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদেছিলেন গুলতেকিন। সেদিনই তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, নিজের মেয়েকে তিনি কখনোই এমন বোকামি করতে দেবেন না। ওর স্বামীর যেন কখনোই সাহস না হয় তাকে ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার!
শুধু এই ঘটনাই নয়, ডিভোর্সের সময়কার চরম অসহায়ত্বের কথাও অকপটে লিখেছেন তিনি। স্বামীর ব্যাংকে কত টাকা আছে, জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট আছে কি না—কিছুই জানতেন না তিনি। এমনকি হুমায়ূনের ‘হোটেল গ্রেভারিন’ সহ অন্যান্য আত্মজীবনীমূলক বইয়ে তাঁকে নিয়ে লেখা অনেক মনগড়া তথ্যেরও প্রতিবাদ করেছেন গুলতেকিন। তিনি বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও হুমায়ূন নাকি বলেছিলেন—”একদম সত্যি হচ্ছে জলের মতো স্বাদহীন, তাই কিছু মিথ্যা থাকলে লোকজন পড়ে মজা পাবে!”
আজ এত বছর পর পেছন ফিরে তাকিয়ে গুলতেকিনের মনে হয়, সেদিনই হয়তো মেয়েকে নিয়ে দেশে ফিরে ওই সম্পর্কটা ভেঙে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ১৮-১৯ বছরের এক তরুণীর পক্ষে সেদিন হয়তো সেই সাহসটা করা সম্ভব হয়নি।
গুলতেকিনের এই হাড়হিম করা গল্প আমাদের সমাজের অনেক মেয়েরই না বলা গল্প। ভালোবাসার মোড়কে লুকিয়ে থাকা এই মানসিক ও শারীরিক অত্যাচারগুলো কতটা ভয়ংকর হতে পারে, গুলতেকিনের এই লেখা যেন তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
মন্তব্য করুন