১৮ জনের মধ্যে ১২ রাষ্ট্রপতিই মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।
শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন মো সাহাবুদ্দিন। জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে লিখিত পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে তার দায়িত্বের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। এর ফলে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। তিনি কেবল দায়িত্ব ছাড়লেনই না, বরং এমন এক ব্যতিক্রমী নজির রেখে গেলেন, যেখানে একই রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালে তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি স্বাধীনতার পর পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে না পারা রাষ্ট্রপতিদের তালিকায়ও যুক্ত হলো নতুন একটি নাম।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। পদত্যাগ কার্যকর হওয়ার পর ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে ১২৩(১) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে পদত্যাগের মাধ্যমে শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বের সমাপ্তি হয়নি; বরং একটি নতুন সাংবিধানিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
মো সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার সাংবিধানিক মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত থাকার কথা ছিল। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই দায়িত্ব ছাড়ায় তার মেয়াদ অসম্পূর্ণ থেকে গেল। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একমাত্র রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় আসেন, যিনি একই মেয়াদকালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার, পরবর্তী অন্তর্বর্তী প্রশাসন এবং পরবর্তীতে গঠিত নতুন সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তনের এমন ধারাবাহিকতার মধ্যে একই রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক অভ্যুত্থান, হত্যাকাণ্ড, গণআন্দোলন এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রভাবের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে বহু রাষ্ট্রপতি নির্ধারিত মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। বিভিন্ন সময়ে কেউ পদত্যাগ করেছেন, কেউ সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এবং কেউ দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। এ বাস্তবতা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিবর্তন এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের অস্থির অধ্যায়গুলোর প্রতিফলন বহন করে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের সময় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রপতির পদকে নতুন সংকটের মুখে ফেলে। খন্দকার মোশতাক আহমেদ অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষমতাচ্যুত হন এবং বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমও পরবর্তীতে পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় নিহত হন, আর আবদুস সাত্তার সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারান। পরবর্তী সময়ে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদও গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির পদ তুলনামূলক স্থিতিশীল হলেও ব্যতিক্রম ঘটেছে। এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন এবং রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এসব ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, রাষ্ট্রপতির পদ সাংবিধানিকভাবে সীমিত নির্বাহী ক্ষমতার হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়।
বিশ্বের সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও রাষ্ট্রপ্রধানের পদ শূন্য হলে সংবিধান নির্ধারিত উত্তরাধিকার ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। ভারত, জার্মানি, ইতালি ও অন্যান্য সংসদীয় গণতন্ত্রে অন্তর্বর্তী দায়িত্ব পালনের বিধান রয়েছে, যাতে রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি না হয়। বাংলাদেশের সংবিধানেও একই ধরনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে স্পিকারকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ শুধু একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ঘটনা। তবে তার পদত্যাগের পেছনে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা থাকলেও আনুষ্ঠানিকভাবে শারীরিক অসুস্থতাকেই কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে যাচাইকৃত তথ্য এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করাই তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতার নীতি।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ক্ষমতার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। এই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও সময়মতো সম্পন্ন হয়, সেটিই আগামী দিনের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য করুন