মাতৃদুগ্ধ কেবল খাদ্য নয়, মা ও শিশুর এক জটিল জৈবিক কথোপকথন: কেটি হিন্দের গবেষণায় উন্মোচিত নতুন দিগন্ত
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক: মাতৃদুগ্ধ কি কেবলই শিশুর ক্ষুধা নিবারণের জন্য ক্যালরি আর পুষ্টির জোগান? দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞান এমনটাই মনে করে আসছিল। কিন্তু সেই প্রচলিত ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছেন বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী ড. কেটি হিন্দে। তার দীর্ঘ গবেষণায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য— মাতৃদুগ্ধ আসলে এক ‘তরল তথ্যভাণ্ডার’ এবং মা ও শিশুর মধ্যে এক নিরবচ্ছিন্ন জৈবিক কথোপকথনের মাধ্যম।
ক্যালিফোর্নিয়ার ল্যাব ও প্রচলিত ধারণার পরিবর্তন
ঘটনার শুরু ২০০৮ সালে। ক্যালিফোর্নিয়ার একটি প্রাইমেট রিসার্চ ল্যাবে কেটি হিন্দে কাজ করছিলেন রিসাস ম্যাকাক প্রজাতির বানরদের মাতৃদুগ্ধ নিয়ে। শত শত নমুনা বিশ্লেষণের পর তিনি যে ডেটা পান, তা ছিল তৎকালীন বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রায় অসম্ভব। তিনি লক্ষ্য করেন, সন্তানের লিঙ্গভেদে মায়ের দুধের উপাদানে ব্যাপক তারতম্য ঘটছে।
তার গবেষণায় দেখা যায়, পুত্রসন্তানের মায়েরা যে দুধ উৎপাদন করছেন, তা ফ্যাট ও প্রোটিনে অত্যধিক সমৃদ্ধ। অন্যদিকে, কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে দুধের পরিমাণ অনেক বেশি এবং এর পুষ্টির অনুপাতও সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রাথমিকভাবে সহকর্মীরা একে যান্ত্রিক ত্রুটি বা কাকতালীয় ঘটনা বলে উড়িয়ে দিলেও, কেটি তার ফলাফলের ওপর আস্থা রাখেন। তার এই অনড় অবস্থানই পরবর্তীতে উন্মোচন করে যে, দুধ কেবল জ্বালানি নয়, বরং এটি সন্তানের জেন্ডার ও প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তিত হতে সক্ষম।
লিঙ্গভেদে দুধের পুষ্টিগুণের তারতম্য ও আচরণের প্রভাব
কেটি হিন্দের গবেষণায় আরও গভীর এক তথ্য বেরিয়ে আসে। ২৫০-এর বেশি মা এবং ৭০০-এর বেশি স্যাম্পলিং ইভেন্ট বিশ্লেষণ করে তিনি দেখেন, অল্পবয়সী মায়েদের দুধে ক্যালরি কম থাকলেও ‘কর্টিসল’ নামক স্ট্রেস হরমোনের উপস্থিতি থাকে বেশি। এই হরমোন শিশুর আচরণ গঠনে ভূমিকা রাখে। যে শিশুরা এই দুধ পান করেছে, তারা অপেক্ষাকৃত বেশি সতর্ক এবং কম আত্মবিশ্বাসী হয়ে বেড়ে উঠেছে। অর্থাৎ, মায়ের দুধ কেবল শিশুর শরীরই গঠন করে না, বরং তার মেজাজ ও ব্যক্তিত্ব গঠনেও প্রভাব ফেলে।
‘ডাক ও সাড়া’: এক অবিশ্বাস্য রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা
কেটির গবেষণার সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কারটি ছিল মা ও শিশুর মধ্যকার ‘ইমিউনলজিক্যাল’ যোগাযোগ। স্তন্যপানের সময় শিশুর মুখের লালা স্তনবৃন্তের মাধ্যমে মায়ের স্তন-টিস্যুতে প্রবেশ করে। এই লালায় থাকে শিশুর শারীরিক অবস্থার সংকেত।
শিশু যদি অসুস্থ থাকে, তবে মায়ের শরীর সেই সংকেত বা ‘কোড’ বিশ্লেষণ করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুধের উপাদান পরিবর্তন করে ফেলে। দুধে শ্বেত রক্তকণিকা এবং ম্যাক্রোফেজ বা ভক্ষক-কোষের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায়। এমনকি শিশুর নির্দিষ্ট অসুস্থতা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডিও তৈরি হয় দুধে। শিশু সুস্থ হয়ে উঠলে দুধ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘কল অ্যান্ড রেসপন্স’ বা ‘ডাক ও সাড়া’— যা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাছেও এক বিস্ময়।
বিজ্ঞানের অবহেলা ও নতুন জাগরণ
২০১১ সালে হার্ভার্ডে যোগ দেওয়ার পর কেটি লক্ষ্য করেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানে মাতৃদুগ্ধ নিয়ে গবেষণার চেয়ে পুরুষের লিঙ্গোত্থানজনিত সমস্যা (Erectile Dysfunction) নিয়ে গবেষণার পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি। ২০০ মিলিয়ন বছর ধরে বিবর্তিত এই প্রাণদায়ী উপাদানটি বিজ্ঞানের টেবিলে ছিল চরম অবহেলিত।
এই বৈষম্য দূর করতে তিনি ‘Mammals Suck… Milk’ নামে একটি ব্লগ চালু করেন, যা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে তার ‘টেপ টক’ (TED Talk) এবং ২০২০ সালে নেটফ্লিক্সের ‘বেবিজ’ সিরিজে তার গবেষণা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে।
ভবিষ্যতের পথচলা
বর্তমানে অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির ‘কম্পারেটিভ ল্যাকটেশন ল্যাব’-এ ড. কেটি হিন্দে তার গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার কাজ আজ বিশ্বব্যাপী এনআইসিইউ (NICU) পরিষেবা, চিকিৎসাপদ্ধতি এবং জনস্বাস্থ্য নীতিতে পরিবর্তন আনছে।
ডাইনোসরদের যুগ থেকে টিকে থাকা এই স্তন্যপায়ীদের বৈশিষ্ট্যটি যে কেবল পুষ্টি নয়, বরং পৃথিবীর প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা— তা আজ প্রমাণিত। ড. কেটির মতে, “মাতৃদুগ্ধ হলো দু’টি দেহের মধ্যে জ্যান্ত ও সদাজাগ্রত এক কথোপকথন, যা মানুষ কথা বলতে শেখার আগেই তার ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়।”
মূল ভাবনার ঋণ: সালাহ উদ্দিন আহমেদ জুয়েল
মন্তব্য করুন