Logo
গোলকিপার ভোঝিনহার ৭ সেভ আর অদম্য লড়াইয়ে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের ঘাম ছুটিয়ে দিল প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কেপ ভার্দে, ম্যাচসেরা মেসি গড়লেন অ্যাসিস্টের নতুন রেকর্ড
ম্যাচ হেরেছে তো কী, মন জিতেছে কেপ ভার্দে
ম্যাচ শেষে একে অপরকে জড়িয়ে ধরছেন কেপ ভার্দের গোলকিপার ভোঝিনহা ও আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ।
স্কোরবোর্ডে লেখা ৩-২ গোলের হার। কিন্তু মাঠ ছাড়ার সময় কেপ ভার্দের চোখেমুখে ছিল না কোনো লজ্জা, বরং গর্ব। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার সামনে দুইবার পিছিয়ে পড়েও দুইবার লড়াইয়ে ফিরে আসা এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র প্রমাণ করে দিল— ফুটবলে জেতা-হারার বাইরেও একটা জায়গা আছে, যেখানে মানুষ ভালোবেসে ফেলে একটা দলকে। ২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর এই ম্যাচ তাই শুধু আর্জেন্টিনার জয়ের গল্প নয়, বরং কেপ ভার্দের হৃদয় জয়েরও গল্প।
ম্যাচের ২৯তম মিনিটে বিশ্বমানের ফিনিশিংয়ে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন লিওনেল মেসি। তারপর একের পর এক আক্রমণ সাজিয়েও ৯০ মিনিটে ম্যাচ শেষ করতে পারেনি ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা— আর তার পেছনের বড় কারণ কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য জেদ। ফিফা র্যাংকিংয়ের ৬৭ নম্বর দল হিসেবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে দুইবার পিছিয়ে পড়েও ১-১ এবং ২-২ ব্যবধানে সমতা ফিরিয়েছে তারা। কোনো অবস্থাতেই ম্যাচ থেকে ছিটকে যায়নি এই দল, বরং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে গেছে সমান তালে।
প্রথম গোল করার পর উদযাপনে মাতেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
দ্বিতীয়ার্ধে কেপ ভার্দের আকস্মিক কাউন্টার অ্যাটাক সামলাতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে। লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর পজিশনিং দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়েই ম্যাচে ফিরে আসে প্রতিপক্ষ।
কেপ ভার্দের এই রূপকথার মতো পারফরম্যান্সের মূল কারিগর গোলকিপার ভোঝিনহা। মেসির বিপজ্জনক ফ্রি-কিকসহ আর্জেন্টিনার অন্তত ৭টি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন তিনি, হয়ে ওঠেন ম্যাচের অন্যতম আলোচিত চরিত্র। বল দখলে বহুগুণ পিছিয়ে থেকেও সুযোগ পেলেই বিদ্যুৎগতিতে কাউন্টারে ছুটেছে কেপ ভার্দে। দেরয় দুয়ার্তের সমতাসূচক গোল এবং অতিরিক্ত সময়ে সিডনি লোপেস ক্যাব্রালের বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া থান্ডারাস শট রেখে গেছে এই বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে।
গ্রুপ পর্বে স্পেন ও উরুগুয়েকে আটকে দেওয়া কেপ ভার্দে এই ম্যাচেও প্রমাণ করল, নকআউট পর্বে তারা এসেছে নিজেদের যোগ্যতাতেই— কোনো ভাগ্যের জোরে নয়।
পরিসংখ্যানও সমানে সমান লড়াই
স্কোরলাইনে ব্যবধান থাকলেও পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। আর্জেন্টিনা ২০টি শট নিয়ে ১০টি লক্ষ্যে রাখলেও কেপ ভার্দে ১৫টি শটের মধ্যে ৫টি রাখে প্রতিপক্ষের গোলমুখে। বল দখলে ৬৪%-৩৬% ব্যবধানে এগিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা ৯২% নির্ভুলতায় ৮২২টি পাস খেললেও কেপ ভার্দের ৮৭% নির্ভুল পাসিংও ছিল নজরকাড়া। কর্নার আদায়ে তো দুই দলই ছিল সম্পূর্ণ সমান— উভয় দল পায় ৮টি করে কর্নার। ফাউলের সংখ্যাতেও (আর্জেন্টিনা ১৩, কেপ ভার্দে ১২) কাছাকাছি ছিল দুই দল, তবে কার্ড দেখেছেন মাত্র একজন করে খেলোয়াড়, লাল কার্ডের মুখ দেখতে হয়নি কাউকেই।
মেসির রাতেও নায়ক হতে পারতেন ভোঝিনহা
জিতেছে আর্জেন্টিনাই, আর সেই জয়ের নায়ক লিওনেল মেসি। ২৯ মিনিটে গোল আর একটি অ্যাসিস্ট মিলিয়ে ৮.৩৮ রেটিং নিয়ে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হয়েছেন তিনি, পুরো ম্যাচে নিয়েছেন ৭টি শট। এই অ্যাসিস্টের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ডও এখন একক ভাবে নিজের করে নিলেন তিনি— এতদিন ৮টি অ্যাসিস্ট নিয়ে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে ছিলেন মেসি, এখন তাঁর অ্যাসিস্ট সংখ্যা ৯।
কিন্তু ম্যাচ শেষে যাঁর নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে, তিনি মেসি নন— তিনি ভোঝিনহা। ট্রফি না জিতলেও, স্কোরবোর্ডে নাম না উঠলেও, একটি জাতিকে গর্বিত করে মাঠ ছেড়েছেন কেপ ভার্দের এই গোলরক্ষক। ফুটবল মাঝেমধ্যে এমনই— জয়-পরাজয়ের অঙ্কের বাইরেও রেখে যায় এমন কিছু গল্প, যা মনে থেকে যায় বহুদিন।
মন্তব্য করুন