ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিলুপ্ত হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কীভাবে ফিরিয়ে আনা যাবে তা নিয়ে চলছে বিভিন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা। বিশেষ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদকসহ পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ (পুনর্বিবেচনার) আবেদন করার পর এ আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বিএনপির পক্ষ থেকেও আলাদা আরেকটি রিভিউ আবেদন করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ নয় তা জানতে চেয়ে সম্প্রতি রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। এ রুলের নিষ্পত্তির সময় আদালত যদি পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল বলে রায় দেন, তা হলে সংবিধান পঞ্চদশ সংশোধনীর পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবে অর্থাৎ সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনঃস্থাপিত হবে। এর ফলে সংসদে এটি নতুন করে আর দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না। যেমনটি রোববার এক রায়ে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণ করা যাবে’ সংবিধানের এ-সংক্রান্ত ৯৬ অনুচ্ছেদ পুরোটাই পুনর্বহাল করেছেন আপিল বিভাগ। সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ২ থেকে ৮ পর্যন্ত বিধান ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছিল। এগুলো পুনর্বহাল করে আপিল বিভাগ রায় দেওয়ায় তা সংবিধানে স্বয়ংক্রিভাবে পুনঃস্থাপিত হবে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের চাপে ১৯৯৬ সালে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস করে বিএনপি সরকার। এর দুই বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়। পরে ২০০৪ সালে বিএনপি সরকার আমলে সেই রিট খারিজ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকসহ সাত বিচারপতির আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দেয়। পরে জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলসহ সংবিধানে বেশ কিছু পরিবর্তন আনে আওয়ামী লীগ।
ছাত্র গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের নির্দেশনা চেয়ে এ রিট করেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন বিশিষ্ট ব্যক্তি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় রিভিউ চেয়ে তারা আবেদন করেন। রিভিউ আবেদন করার কারণ সম্পর্কে আবেদনকারীদের আইনজীবী এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য শরীফ ভূঁইয়া বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা গণতন্ত্র, ভোটাধিকারকে সুসংহত করে, এগুলো সংবিধানের মূল কাঠামোর অংশ। কাজেই আপিল বিভাগ একটা রায় দিয়ে এটি বাতিল করতে পারে না। এ ছাড়া আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করতে গিয়ে কিছু ক্ষমতা ব্যবহার করেছে যেগুলো বিচার বিভাগ বা নির্বাহী বিভাগের করার কথা। এটি ক্ষমতা পৃথকীকরণ নীতির পরিপন্থী ছিল। এ ছাড়া রায়ে অনেক আইনগত ত্রুটি রয়েছে। যেমন সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়েছিল, দুটো নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করতে হবে। পরে বিস্তারিত আদেশে এটি বাদ দেওয়া হয়েছে। কাজেই এটি পরস্পরবিরোধী রায় ছিল। তিনি বলেন, রায়টা রিভিউ হয়ে বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে দেওয়া রায় যদি বাতিল হয় তা হলে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানে ফিরে আসবে।
সুজন সম্পাদক এবং সরকারের নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী ছিল অসাংবিধানিক। এর মাধ্যমে ভোটাধিকার হরণ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অকার্যকর করা হয়েছে। তারা আশা করছেন, এ সংশোধনী বাতিল হয়ে যাবে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনেক অন্যায় করা হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সেগুলোর বিহিত হওয়া দরকার। এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আসবে, এটি একটা ভিত তৈরি করবে। এর ভিত্তিতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন সংস্কার করতে পারবে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে।
সুুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, সংবিধান একটি জীবন্ত রাজনৈতিক দলিল। সময়ের প্রয়োজন মেটাতে না পারলে এর কার্যকারিতা থাকে না। সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব সংবিধানকে প্রাসঙ্গিকভাবে ব্যাখ্যা করা, যান্ত্রিকভাবে নয়। এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ফলে ত্রয়োদশ সংশোধনী সংশ্লিষ্ট মৌলিক মর্যাদা অর্জন করে। সুপ্রিম কোর্ট এ মৌলিক স্তম্ভ অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে পারে না। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারসহ দেশের সব রাজনৈতিক দলই চাচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানে ফিরে আসুক। এ কারণে উচ্চ আদালতে বিষয়টি শুনানির সময় সরকার ও রিটকারীর আইনজীবীরা একমত হবেন। অর্থাৎ কেউই বিপক্ষে কথা বলবেন না। উভয় পক্ষ যদি আদালতকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং নাগরিকের অধিকারের পরিপন্থী ছিল, তা হলে আদালত রায় পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আদালতের রায়ে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিল পাস করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। পরে এর বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট করেন ৯ জন আইনজীবী। ২০১৬ সালের ৫ মে হাইকোর্টের তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। একই বছরের ৩ জুলাই তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার (এসকে সিনহা) নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সর্বসম্মতিতে আপিল খারিজ করে রায় দেন। ফলে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকে। পরে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা বহাল রেখে আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদন নিষ্পত্তি করে রোববার সংবিধানের এ-সংক্রান্ত ৯৬ অনুচ্ছেদ পুরোটাই পুনর্বহাল করে আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ২ থেকে ৮ পর্যন্ত বিধান ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যম বাতিল করা হয়েছিল। এগুলো পুনর্বহাল করে আপিল বিভাগ রায় দেওয়ায় তা সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনঃস্থাপিত হবে।