গত ১৫ বছরে দেশের বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ অনুমোদন ও পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও এমপি। রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বেসরকারি চিকিৎসা খাত পরিচালিত হওয়ায় গত দেড় দশকে আলোর মুখ দেখেনি। নানা শর্তে বেসরকারি চিকিৎসা খাত চালানোর কথা থাকলেও ক্ষমতার দাপটে সব শর্তই উপেক্ষিত হয়েছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রভাব বিস্তারে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়।
এতে করে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও মানসম্মত শিক্ষা পাননি শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষক সংকট, ক্লাসরুম সংকট, লাইব্রেরিতে অপর্যাপ্ত আসন সংখ্যা ও মিউজিয়ামে সরঞ্জাম ঘাটতি থাকলেও সমাধানে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রভাব খাটিয়ে সংকটেও পরিচালিত হয়েছে শিক্ষাকার্যক্রম। এতে প্রভাশালীদের পকেট ভরলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
২০২২ সালের বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইনে ৫০ আসনের বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের জন্য মেট্রোপলিটন এলাকায় কলেজের নামে ন্যূনতম দুই একর এবং মেট্রোপলিটনের বাইরে ন্যূনতম চার একর জমি থাকতে হবে। তবে মেট্রোপলিটন এলাকায় আইন পাসের আগে একাডেমিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের নামে ন্যূনতম এক একর জমি থাকতে হবে। এই জমি কলেজের নামে নিরঙ্কুশ, নিষ্কণ্টক, অখণ্ড ও দায়মুক্ত হতে হবে। একাডেমিক ও হাসপাতাল মিলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ সর্বনিম্ন ২ লাখ বর্গফুট ফ্লোর স্পেস থাকতে হবে।
তবে বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। রাজধানীর ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ, এমএইচ শমরিতা মেডিক্যাল কলেজ, পপুলার মেডিক্যাল কলেজ, গ্রিনলাইফ মেডিক্যাল কলেজ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ, সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ, ইস্ট-ওয়েস্ট মেডিক্যাল কলেজ, মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর ভূঁইয়া মেডিক্যাল কলেজ ও গাজীপুরের ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের নথি বিশ্লেষণ করে নানা অসংগতির বিষয়টি উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে বারবার সময় বেঁধে দিলেও ক্ষমতার প্রভাবে শর্ত পূরণ করেনি।
গত বছর স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেশের ৭৩ বেসরকারি মেডিকেল কলেজের তথ্য প্রকাশ করা হয়। সেখানে প্রভাবশালীদের মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক, জনবলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ নেই।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিশেষজ্ঞ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আফজালুর রহমান বলেন, যত্রতত্র মেডিক্যাল কলেজের বেশিরভাগ মানসম্মত নয়। বেশিরভাগই ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। ব্যবসায়িক স্বার্থে মেডিক্যাল কলেজ ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক স্বার্থে এগুলো ব্যবহার করতে দেওয়া ঠিক হবে না।
তিনি আরো বলেন, আদৌ দেশে এত মেডিক্যাল কলেজ দরকার আছে কি না, সেটা ভেবে দেখা দরকার। প্রতিবেশী ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করে দেখতে পারি দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে কত মেডিক্যাল কলেজ এ দেশে থাকা দরকার। এত মেডিক্যাল কলেজ প্রয়োজন না হলে, সেগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।
এসব অসংগতির বিষয়ে বক্তব্য নিতে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন খান, এমএইচ শমরিতা মেডিক্যাল কলেজের চেয়ারম্যান আহসানুল ইসলাম টিটু এবং ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের এমডি ও বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমসিএ) সভাপতি এম এ মুবিন খানের মুঠোফোনে কল করা হলে তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে এসব প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংশ্লিষ্টদের কেউই দেশে নেই। তবে গ্রিনলাইফ মেডিক্যাল কলেজের এমডি ডা. মো. মঈনুল আহসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেছে।
তিনি বলেছেন, কলেজ ও হাসপাতালের স্পেস ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে। কলেজ পরিদর্শন প্রতিবেদনে যে ঘাটতির কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কিছুই এখন আর অপূর্ণ থাকার কথা নয়।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, বেশকিছু মেডিক্যাল কলেজ মানসম্মত নয়। একেকটার একেক সমস্যা। কোনোটার অবস্থা একেবারে ভয়াবহ। বন্ধ করে দেওয়ার মতো। দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখেছি ছয়টি মেডিক্যাল কলেজের অবস্থা খুবই খারাপ। সেই ছয়টি মেডিক্যাল কলেজ নিয়ে সভা করেছি। কয়েকটির অবস্থা আরেকটু ভালো। তুলনামূলকভাবে একটু ভালো বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোকে কীভাবে সচল কর যায়, সেই উপায় নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। মুশকিল হলো একটি মেডিক্যাল কলেজের নির্দেশ আছে পরিদর্শনের। সেখানে পরিদর্শন রিপোর্ট অনেক পুরোনো। ওই মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা ওই পরিদর্শন রিপোর্টের পর কাজ করেছে। এখন পরিদর্শন টিম গঠন করতে গেলে বিএমডিসি প্রতিনিধি প্রয়োজন হয়। এই মুহূর্তে বিএমডিসি নেই। বিএমডিসি গঠন না হওয়া পর্যন্ত পরিদর্শনও করা যাচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন, আমরা আশা করছি, শিগগির বিএমডিসি গঠন করা হবে। এরপর পরিদর্শন রিপোর্ট ধরে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।