চীনের চোখ বঙ্গোপসাগরে: বাংলাদেশ কী পাবে, কী দেবে? | bdsaradin24.com
ডেস্ক নিউজ
২৭ জুন ২০২৬, ১২:০৩ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

চীনের চোখ বঙ্গোপসাগরে: বাংলাদেশ কী পাবে, কী দেবে?

চীনের চোখ বঙ্গোপসাগরে: বাংলাদেশ কী পাবে, কী দেবে?

মানচিত্রটি ভালো করে দেখুন। কুনমিং থেকে লাশিও, লাশিও থেকে মান্দালয়, তারপর রাখাইন উপকূলের কিয়াউকফিউ বন্দর—এই পথটি শুধু একটি রাস্তা নয়। এটি চীনের বঙ্গোপসাগরে নামার সম্ভাব্য করিডোর।

চীনের জন্য মালাক্কা প্রণালী বড় দুর্বল জায়গা। ভবিষ্যতে কোনো বড় সংঘাত বা অবরোধ হলে এই পথ চীনের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই চীন বহুদিন ধরেই বিকল্প সমুদ্রপথ ও স্থল-সমুদ্র করিডোর খুঁজছে।

এই জায়গায় মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর চীনের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে কিয়াউকফিউ পৌঁছাতে পারলে চীন সরাসরি বঙ্গোপসাগরের দরজায় চলে আসে। এরপর চট্টগ্রাম, মোংলা ও বাংলাদেশের বন্দরগুলো বৃহত্তর বাণিজ্য হিসাবের অংশ হতে পারে।

কিন্তু সমস্যা হলো, মিয়ানমার এখন স্থিতিশীল নয়। রাখাইনে আরাকান আর্মি শক্তিশালী। জান্তা সরকারও পুরো দেশ আগের মতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। তাই মিয়ানমার রুট চীনের দরকার হলেও সেটি পুরোপুরি নিরাপদ নয়।

এই জায়গায় বাংলাদেশ চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের আছে বঙ্গোপসাগর, চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর, শ্রমবাজার, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং আঞ্চলিক অবস্থান। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সরাসরি সীমান্ত নেই। তাই China–Myanmar–Bangladesh corridor বাস্তবায়ন করতে হলে মিয়ানমারকে বাদ দেওয়া যায় না।

এখানেই ভারতের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন বাংলাদেশ অনেক স্থল যোগাযোগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে ভারতের ভৌগোলিক বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু যদি চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর বাস্তব হয়, তাহলে বাংলাদেশ ভারতের ওপর আগের মতো একমাত্র নির্ভরশীল থাকবে না।

দিল্লির অস্বস্তি এখানেই। কারণ করিডোর মানে শুধু পণ্য চলাচল নয়। করিডোর মানে প্রভাব, বন্দর ব্যবহার, অর্থনৈতিক অঞ্চল, রুট নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা হিসাব। চট্টগ্রাম, মোংলা বা বঙ্গোপসাগর যদি চীনা করিডোর-কৌশলের অংশ হয়ে যায়, ভারত এটাকে শুধু অর্থনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখবে না।

তবে “ভারত চট্টগ্রাম দখল করবে”—এভাবে বলা বাস্তবসম্মত নয়। ভারতের সম্ভাব্য পথ হবে কূটনৈতিক চাপ, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ, সীমান্ত রাজনীতি, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো।

ভারতের আসল ভয় হলো পূর্ব দিকের নিরাপত্তা। পশ্চিমে পাকিস্তান, উত্তরে চীন, আর পূর্বে বঙ্গোপসাগর ঘিরে চীনা প্রভাব—এই সমীকরণ দিল্লির জন্য সহজ নয়। বিশেষ করে চীন যদি বাংলাদেশে বন্দর, শিল্পাঞ্চল, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ায়, তাহলে ভারত সেটিকে কৌশলগত চোখে দেখবেই।

বাংলাদেশের জন্য এখানে সুযোগও আছে, ঝুঁকিও আছে। সুযোগ হলো চীনা বিনিয়োগ, কারখানা, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বন্দর উন্নয়ন এবং নতুন আঞ্চলিক সংযোগ। ঝুঁকি হলো বাংলাদেশ যদি ভারসাম্য হারায়, তাহলে ভারত, চীন ও আমেরিকার প্রতিযোগিতার মাঝখানে পড়ে যেতে পারে।

আসল প্রশ্ন তাই একটাই—বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে কী আদায় করতে পারবে, আর তার বিনিময়ে বাংলাদেশকে কী দিতে হবে? শুধু চুক্তির ছবি দেখে উল্লাস করলে হবে না। শর্ত, ঋণ, বন্দর ব্যবহার, নিরাপত্তা হিসাব এবং বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে—এসব জানতে হবে।

চীন বঙ্গোপসাগরে আসতে চায়, কিন্তু শুধু বন্ধুত্বের জন্য নয়। এর পেছনে আছে বাণিজ্য, জ্বালানি, করিডোর, বন্দর, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সামরিক-কৌশলগত হিসাব।

বাংলাদেশ যদি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে খেলে, তাহলে এই করিডোর থেকে বিনিয়োগ, চাকরি, রপ্তানি ও অবকাঠামোর সুবিধা নিতে পারে। কিন্তু চোখ বন্ধ করে চললে করিডোর অন্যের হবে, আর ঝুঁকির বোঝা থাকবে বাংলাদেশের ঘাড়ে।

বঙ্গোপসাগর এখন শুধু সমুদ্র নয়। এটি ভবিষ্যতের বাণিজ্য, নিরাপত্তা, করিডোর এবং বড় শক্তির প্রতিযোগিতার কেন্দ্র।

এখানে বাংলাদেশ তার নিজের স্বার্থ আগে দেখছে। কিন্তু চীনও তার স্বার্থ আগে দেখছে। ভারত, আমেরিকা বা অন্য বড় শক্তিও একই কাজ করবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কেউ কারও জন্য নিঃস্বার্থ বন্ধু নয়; সবাই নিজের লাভ, নিরাপত্তা, প্রভাব ও ভবিষ্যৎ অবস্থান হিসাব করে এগোয়।

তাই প্রশ্ন হলো, এই বড় শক্তির খেলায় বাংলাদেশ কি নিজের স্বার্থ আদায় করতে পারবে, নাকি করিডোর, বন্দর ও বঙ্গোপসাগরের হিসাব শেষে ঝুঁকির বোঝা বাংলাদেশের ঘাড়েই পড়বে? বাংলাদেশ যদি হিসাব করে খেলে, লাভ তার। আর যদি অন্যের খেলায় গুটি হয়ে যায়, পরিণতি ভয়ংকর হতে পারে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এনসিপি-জামায়াত জোটে ভাঙনের গুঞ্জন

একমি ল্যাবরেটরিজের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রতিষ্ঠাতা হামিদুর রহমান সিনহা

মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলে যেসব সমস্যা হতে পারে

মির্জা ফখরুলই হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি

বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪ টুথপেস্টের ২৬টিতেই মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক

১৮ জনের মধ্যে ১২ রাষ্ট্রপতিই মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।

সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগপত্রঃ একটি জটিল এবং ধূর্ত মনস্তাত্ত্বিক দলিল!?

নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন কীভাবে

ফার্মেসী ব্যবসার জন্যে লাইসেন্সসহ যা যা লাগবে

নতুন ফার্মেসি ব্যবসার প্রথম ধাপ: কীভাবে করবেন ড্রাগ লাইসেন্স?

১০

পঞ্চদশ সংশোধনী: কেন এসেছিল, কী বদলেছিল, কেন আবার আলোচনায়?

১১

ইতিহাস ও নিসর্গের অপূর্ব মেলবন্ধন ‘বলধা গার্ডেন’

১২

যে পিৎজা বাঁচাল একটি প্রাণ: ডমিনোজের কর্মীদের ছোট্ট মানবিকতার বড় গল্প

১৩

বন্যা ও পানিতে ডুবে মৃতদের দাফনের নিয়ম

১৪

সোনালী অতীতের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র: সিরাজুল ইসলাম ও রানী সরকার

১৫

হালান্ডকে নিয়ে অজানা কিছু কথা

১৬

হলান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিলকে কাঁদিয়ে শেষ আটে নরওয়ে

১৭

মুক্তচিন্তার পথিক: মুস্তাফা মনোয়ার

১৮

পাসপোর্ট এল কেমন করে

১৯

পাসপোর্টের কোন রং দিয়ে কী বোঝায়

২০