সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম।
চাকরিজীবী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, বিধবা নারী, গৃহিণী কিংবা প্রবাসীদের পরিবারের অনেকেই ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভর করেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক বিভিন্ন নীতিগত পরিবর্তনের ফলে মনে হচ্ছে, এই নিরাপদ সঞ্চয়ের পথটিকেই ক্রমশ কঠিন করে তোলা হচ্ছে।
প্রথমত, উৎসে করের চাপ বৃদ্ধি ।
আগে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ৫% হারে উৎসে কর কাটা হতো, আর তার বেশি হলে ১০%।
এখন সব ক্ষেত্রেই ১০% উৎসে কর কাটার প্রস্তাব বা আলোচনা এসেছে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরাও সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়বেন।
দ্বিতীয়ত, একই আয়ের ওপর দ্বৈত করের আশঙ্কা।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা পাওয়ার সময় উৎসে কর কাটা হচ্ছে।
এরপর আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় সেই মুনাফা আবার করযোগ্য আয়ের অংশ হিসেবে বিবেচিত হলে অনেক সাধারণ মানুষ এটিকে কার্যত দ্বৈত করের বোঝা হিসেবে দেখছেন।
যদিও কর ব্যবস্থায় সমন্বয়ের বিধান থাকতে পারে, বাস্তবে সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টি জটিল হয়ে দাঁড়ায়।
তৃতীয়ত, ব্যাংক হিসাব, TIN ও রিটার্নের অতিরিক্ত ঝামেলা।
অনেকেই শুধুমাত্র সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য একটি ব্যাংক হিসাব খুলে থাকেন।
সেই হিসাব সচল রাখতে বিভিন্ন ব্যাংক চার্জ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বহন করতে হয়।
এখন যদি বাধ্যতামূলকভাবে TIN নিতে হয় এবং প্রতি বছর রিটার্ন জমা দিতে হয়, তাহলে একজন ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীকে অতিরিক্ত প্রশাসনিক ঝামেলা, জটিলতা ও খরচের মুখোমুখি হতে হবে।
চতুর্থত, সেবা গ্রহণে ভোগান্তি।
সঞ্চয়পত্র কেনা, মুনাফা তোলা বা ভাঙানোর ক্ষেত্রে এখনও অনেক জায়গায় দীর্ঘসূত্রতা, কাগজপত্রের ঝামেলা ও জটিলতা দেখা যায়।
টিন, রিটার্ন প্রভৃতি সঞ্চয়পত্র ক্রয় করাকে আরো কঠিন করে তুলবে।
পঞ্চমত, বয়স্ক ও অশিক্ষিত বিনিয়োগকারীদের দুর্ভোগ।
গ্রামের অসংখ্য মা, খালা, চাচি কিংবা অবসরপ্রাপ্ত মানুষ আছেন, যারা আয়কর রিটার্ন কী বা কীভাবে জমা দিতে হয়, সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখেন না।
তাদেরকে অন্যের সাহায্য নিতে হবে, দালাল বা পেশাদার সেবাদাতাকে টাকা দিতে হবে অথবা বারবার অফিসে ঘুরতে হবে।
এতে তাদের জন্য সঞ্চয়পত্র পরিচালনা করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
এখন সাধারণ জনগণের প্রশ্ন হলো,
যে মানুষগুলো ব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে যান না, শেয়ারবাজার বোঝেন না, বরং কষ্টের টাকা জমিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনে ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে চান,নীতিগত পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চাপ কেন তাদের ওপরই পড়বে?
রাষ্ট্রের রাজস্ব প্রয়োজন আছে, করের আওতা বাড়ানোরও প্রয়োজন আছে।
কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় যদি একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, একজন গৃহিণী, একজন বিধবা নারী বা একজন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর সঞ্চয়কেই সবচেয়ে বেশি নিরুৎসাহিত করা হয়, তাহলে সেটি কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়,একটি সামাজিক প্রশ্নও হয়ে দাঁড়ায়।
আবার কিছু ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার সঞ্চয়পত্রের সাথে সরকারি বিল, বন্ড বিক্রির দিকে গুরুত্ব দিতে চাচ্ছেন বিধায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফা এবং ক্রয়ে বিভিন্ন নীতিগত পরিবর্তন আনছেন।
সাধারণ জনগণের মাঝে ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সামাল দেওয়াই এখন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
মন্তব্য করুন