বলিউড কিংবা হলিউডের বড় তারকাদের পর্দার বাইরের জীবন নিয়ে ভক্তকুলের আগ্রহে সামান্যতম কমতি নেই। তারা কোথায় যাচ্ছেন, কী পরছেন কিংবা কার সঙ্গে প্রণয়ের সম্পর্কে আছেন- তা নিয়ে সব সময় থাকে বাড়তি আগ্রহ। বাংলাদেশের ক্রিকেটে সেই মানের বড় তারকা সাকিব আল হাসান। মাঠে ব্যাটে-বলে নিজেকে প্রমাণ করে এভারেস্টসম উচ্চতায় তুলেছেন নিজেকে। মাঠে এমন দারুণ সাকিবের পুরোপুরি উল্টো মাঠের বাইরে। মিরপুর থেকে লর্ডস- বিশ্বের যে প্রান্তে খেলতে নেমেছেন কোনো না কোনো রেকর্ড তার সঙ্গী হয়েছে। ঠিক একই সময়ে মুদ্রার উল্টোপিঠে মাঠের বাইরে প্রতিনিয়ত তৈরি করেছেন একের পর এক বিতর্ক। তবে কোনো বিতর্ক বেশি দিন স্থায়ী হয়নি তার মাঠের পারফরম্যান্সের কারণে। প্রতিটি সমালোচনার উত্তর দিয়েছেন মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে। তবে বিতর্ক যে সাকিবের ক্যারিয়ারের ছায়াসঙ্গী তা নিয়ে ক্রিকেট সমর্থকের মধ্যে নেই কোনো দ্বিমত।
২০১০
২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গনে পা রাখা সাকিব প্রথমবার নিজেকে বিতর্কের সঙ্গে জড়ান ২০১০ সালে। ওই বছর মিরপুরে ভারতের বিপক্ষে এক ম্যাচে সাইট স্ক্রিনের সামনে দর্শকের নড়াচড়ায় বিরক্ত হয়ে ওঠেন সাকিব আল হাসান। রেগে হুট করে ক্রিজ ছেড়ে বাউন্ডারি লাইনে এসে ওই দর্শককে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করেন।
২০১১
বিশ্বকাপে মিরপুরের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৫৮ রানে অলআউট হওয়ার ম্যাচে দর্শকরা পুরো বাংলাদেশ দলকে দুয়োধ্বনি দেয়। সেটা সহ্য করতে না পেরে দর্শকদের উদ্দেশে আঙুল দেখিয়ে বাজে ইঙ্গিত করেন।
২০১৩
বিজয় দিবস টি-টোয়েন্টি ম্যাচ চলাকালে সাকিবের কাছে অটোগ্রাফ চান এক দর্শক। তবে তাকে অটোগ্রাফ দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে ওই দর্শক কটুক্তি করলে গ্যালারিতে গিয়ে তার শার্টের কলার চেপে ধরেন সাকিব।
২০১৪
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে ছক্কা মারতে গিয়ে ক্যাচ আউট হন সাকিব আল হাসান। তিনি ড্রেসিংরুমে ফেরার পর ওই আউটের পর ধারাভাষ্যকাররা কথা বলছিলেন। সেই সময় সম্প্রচার ক্যামেরায় বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমের দৃশ্য দেখানো হচ্ছিল। ক্যামেরা দেখে অশালীন অঙ্গভঙ্গি করেন সাকিব। এ ঘটনায় সাকিব তিন ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হন। একই বছর দর্শক পিটিয়ে ফের সমালোচনার তৈরি করেন সাকিব। তার স্ত্রী শিশিরকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করার অভিযোগে গ্যালারিতে উঠে এক দর্শককে পেটান।
২০১৫
২০১৪ সালে দুটো বিতর্কের জন্ম দেওয়া সাকিব এবার আম্পায়ারের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। বিপিএল চলাকালে আম্পায়ার তানভীর আহমেদের সঙ্গে অসদাচরণ করে এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হন।
২০১৬
আগের আসরে আম্পায়ারের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা সাকিব একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন। বিপিএলের কোয়ালিফায়ারে বিতর্কের জন্ম দেওয়া সাকিবকে এবার অবশ্য কোনো ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি।
২০১৭
দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের ঠিক আগ মুহূর্তে হুট করে জাতীয় দল থেকে ছুটি চান সাকিব আল হাসান। মানসিক অবসাদের কারণ দেখিয়ে ছয় মাসের ছুটি চান। তবে কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে সাকিবের এমন সিদ্ধান্তে রাজি ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত তিন মাসের ছুটি পান তিনি।
২০১৮
এতদিনে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে নিয়মিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন সাকিব আল হাসান। প্রত্যেকটা টুর্নামেন্ট খেলতে বিসিবি থেকে পান অনাপত্তিপত্র। তবে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (সিপিএল) খেলার জন্য অনাপত্তিপত্র পাননি তিনি। তবুও সিপিএল খেলতে উড়ে যান। সেখান থেকে তাকে ফিরিয়ে আনায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের হুমকি দিয়ে ছয় মাসের জন্য নিষিদ্ধ হন সাকিব।
২০১৯
বিশ্বকাপ যাত্রার আগে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে হওয়া ফটোসেশনে ছিলেন না সাকিব আল হাসান। এমন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সাকিবের অনুপস্থিতি বেশ বড় সমালোচনার জন্ম দেয়। পরে অবশ্য ওই সমালোচনা চাপা থাকে বিশ্বকাপে তার দারুণ পারফরম্যান্সের দরুণ। বিশ্বকাপের পর ক্রিকেটারদের আন্দোলন নিয়ে বেশ সমালোচনার মুখে পড়েন সাকিব আল হাসান। ধারণা করা হয়, তার নিষেধাজ্ঞার খবর খানিকটা আড়াল করতে এই আন্দোলন সংঘটিত করেছেন।
ফিক্সিং প্রস্তাব আড়াল করে নিষিদ্ধ
২০১৯ সালে সাকিবকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে আইসিসি। জুয়াড়িদের কাছ থেকে প্রস্তাবের মেসেজ গোপন করে এই নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন।
২০২১
নিষেধাজ্ঞা থেকে ফিরে সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর পাশে থাকতে নিউজিল্যান্ড সফর থেকে ছুটি নেন সাকিব আল হাসান। পরে আইপিএল খেলতে শ্রীলঙ্কা সফর থেকে ছুটি নেন। তার এই ঘটনাও বেশ সমালোচনার তৈরি করেছিল। করোনাকালীন সময় আন্তর্জাতিক কিংবা ঘরোয়া সব টুর্নামেন্ট হয়েছে জৈব সুরক্ষাবলয়ের ভেতর। ওই বছর মোহামেডানের হয়ে প্রিমিয়ার লিগ খেলার সময় জৈব সুরক্ষাবলয় ভেঙে অনুশীলন করেন তিনি। যা তৈরি করেছিল বিতর্ক।
স্ট্যাম্পে লাথি
২০২১ সালে সাকিবকে নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল স্ট্যাম্পে লাথি মারার ঘটনা। আম্পায়ার তানভীর আহমেদের সিদ্ধান্ত সাকিবের পক্ষে না যাওয়ায় সবাইকে অবাক করে স্ট্যাম্পে লাথি মারেন সাকিব আল হাসান। একই ম্যাচ বৃষ্টির কারণে ম্যাচ অফিশিয়ালরা খেলা সাময়িক বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলে স্ট্যাম্প তুলে উইকেটে আছাড় মারেন। যে ঘটনায় তিন ম্যাচ নিষিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় তাকে।
২০২২
জুয়াড়িদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য গোপন করে নিষিদ্ধ হওয়া সাকিব ফের জড়ান জুয়ার সঙ্গে। এক জুয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে সমালোচনার মুখে পড়েন।
২০২৩
ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে এক সাক্ষাৎকারে সতীর্থ তামিম ইকবাল সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করেন সাকিব আল হাসান। এ ছাড়া এই বিশ্বকাপে তার চোখের সমস্যাও লুকিয়ে রাখেন তিনি। একই বছর হত্যা মামলার আসামি আরভ খানের শোরুম উদ্বোধন করতে দুবাই উড়ে যান সাকিব। সে ঘটনাতেও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে।
২০২৪
দেশে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে কানাডায় গ্লোবাল টি-টোয়েন্টি লিগ খেলছিলেন সাকিব। সেখানে আন্দোলন নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে- দর্শকদের উদ্দেশে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘দেশের জন্য কী করেছেন?’ এ ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়েন সাকিব আল হাসান।
এ ছাড়া শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে ছিল। সেখানে বাবার ভুল নাম দেওয়ার অভিযোগ ছিল। শেয়ারবাজার ম্যানিপুলেট করার অভিযোগে সম্প্রতি জরিমানার মুখে পড়েছেন। এ ছাড়া অসংখ্যবার বিভিন্ন জায়গায় শোরুম উদ্বোধন করতে যাওয়া কিংবা বিজ্ঞাপন করতে যাওয়ার আগে বিসিবির অনুমতি না নেওয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এমন কী শোরুম উদ্বোধন কিংবা বিজ্ঞাপন করতে গিয়ে ভক্তদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের অসংখ্য অভিযোগ আছে সাকিবের বিরুদ্ধে। এত সব অভিযোগের মধ্যে রাজনীতিতে সাকিবের যোগ দেওয়া নিয়েও আছে বিতর্ক। গুঞ্জন আছে- সাকিব আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার আগে অন্য আরেকটি রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। এসবের পাশাপাশি তার বিভিন্ন ব্যবসা ও কাঁকড়া খামারে কাজ করা শ্রমিকদের ঠিকঠাক বেতন না দেওয়ার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।
ক্যারিয়ারজুড়ে অসংখ্য বিতর্কের জন্ম দেওয়া সাকিব বিদায়ের আগে নতুন কোনো বিতর্কের জন্ম দেন কি না সেটাই দেখার অপেক্ষা।
মন্তব্য করুন