একটি ছবি, বহু প্রশ্ন: নাগরিক পার্টির নারী রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সংকট | bdsaradin24.com
দিলশানা পারুল (ফেইসবুক স্ট্যাটাস থেকে সংগ্রহিত)
৩১ মে ২০২৬, ১০:০৪ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

একটি ছবি, বহু প্রশ্ন: নাগরিক পার্টির নারী রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সংকট

নাগরিক পার্টি গঠনের মাত্র এক বছর জীবদ্দশায় ফেসবুকে পোস্ট দেয়া এই ডিল ডান ছবিটা ছিল biggest political blunder. এই ছবিটা এমন এক ব্লান্ডার যে ব্লান্ডারের ক্ষতি পূরণ করে উঠতে নাগরিক পার্টির আগামী আরো তিন চার বছর লাগবে। তারপরও এটা ক্ষত হিসেবে রয়ে যাবে পার্টির হিস্ট্রিতে।

এবং বছরের পর বছর এটা নিয়ে পার্টিকে ট্রল হজম করতে হবে। এই একটা ছবিই মোটামুটি এটা প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে যে নাগরিক পার্টি নারী বিরোধী অবস্থানে আছে।

এখানে যে নারীদেরকে দেখা যাচ্ছে তারা নাগরিক পার্টির একদম প্রথম সারির নেত্রী ছিলেন। আমি এই সমালোচনা টা লিখছি একদম থার্ড আই পলিটিকাল এনালাইসিস এর জায়গা থেকে। পার্টির কোন সদস্য হিসেবে না। বরং এখানকার নেত্রীদেরকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলে এই সমালোচনা টা বহু আগেই দিতাম এবং আরো অনেক কঠিন করে লিখতাম। আর পুরা বিষয়টা যেহেতু পাবলিকলি বহু আলোচিত সমালোচিত বিষয়, সে জন্যই এখন বিষয়টা নিয়ে লিখতে পারছি কারণ এটার মধ্যে আসলে আর দলীয় বলে কিছু নাই, সবই পাবলিক আলোচনা।

বিভিন্ন টকশোতে তাজনুভা এবং সামান্থা শারমিনকে জামাতে ইসলামীর সাথে নাগরিক পার্টির জোট করার পিছনে তাদের বিরোধের অন্যতম একটা কারণ হিসেবে বলতে শোনা গেছে যে, পার্টি যে প্রক্রিয়ায় জামাতের সাথে জোট করার যে সিদ্ধান্তটি নিয়েছে সেটি কোন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়নি।

সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার পার্টির আহ্বায়কের সাথে নির্বাচনী জোট নিয়ে আলোচনার ভিত্তিতে এই যে ছবিটা তারা পোস্ট করলো ডিল ডান বলে, এই আলোচনা টি যে তারা নাগরিক পার্টির আহবায়কের সাথে করতে গেছে সেটিও তারা কোন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ফলো করে যায়নি। এই সুনির্দিষ্ট আলোচনার বিষয় এই পাঁচ জন নারী নেত্রীর বাইরে নাগরিক পার্টির অন্য কোন নারী জানতো বলে আমার জানা নেই।

এই ছবিটি যখন তোলা হয় এই অবস্থায় নারী সংগঠনের দায়িত্বে ছিলাম আমি। তারা এই ছবি কিংবা আহবায়কের সাথে আলোচনার বিষয়টি ঘুনাক্ষরেও আমার সাথে কোন ধরনের কোন আলোচনা করেনি। আমি ধরে নিচ্ছি তারা প্রত্যেকেই যেহেতু নাগরিক পার্টিতে আমার চেয়ে বড় নেত্রী সেই জায়গা থেকে আমার সাথে কথা বলা প্রয়োজন আছে এমনটা তারা মনে করেনি। কিন্তু যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দোহায় তারা দিচ্ছে তারা নিজেরাই নারী গ্রুপের মধ্যে সে গণতান্ত্রিক চর্চা করেনি। শুধু নারী সেলের প্রধাণ হিসেবে আমিই না ওই সময়ে নারী গ্রুপে আমাদের সদস্য চব্বিশ জনের বাকিরা এ বিষয়টি জানতো আমার এরকম জানা নেই।

এই নারীনেত্রীর অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় বলেছে যে তারা নাগরিক পার্টির নারীদের প্রতিনিধি হিসেবে মনে করছে যে জামাত জোটের সাথে যাওয়া সঠিক না। অথচ তারা নিজেদের বাইরে দলের অন্য কোন নারীর সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করেনি। কেন তারা অন্য নারীদের সাথে আলোচনা না করে সিদ্ধান্ত নিলেন সেটার কারণ বিভিন্ন হতে পারে। এরকম ধারণা হতে পারে যে তাদের সমকক্ষ রাজনৈতিক বুঝ হয়ত অন্যদের নাই অথবা অন্যদের ক্ষেত্রে তারা আস্থা রাখতে পারেননি সুনির্দিষ্ট এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে। কিন্তু কারণ যাই হোক প্রক্রিয়াটি গণতান্ত্রিক হয়নি এবং দলীয় যে নারীদের দ্বারা প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করেছেন তাদের কোন মতামতের গুরুত্ব তারা দেননি, আমার পয়েন্ট হচ্ছে এটাই। পার্টির সকল নারীর হয়ে উনারা নিজেরা সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না।

এটা গেল প্রক্রিয়ার প্রশ্নে এবার আসি রাজনীতির প্রশ্নে।

এর আগে একাধিক লেখায় লিখেছি আবারো উল্লেখ করছি গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামাতে ইসলামী হচ্ছে সবচেয়ে বড় স্টিগমা বা ট্যাবু। রাজনীতিতে বিছুটি পাতার মতো। যাকে যখন ভীলিফাই করা দরকার হয় তাকে জামাতের সাথে ট্যাগ দিয়ে ফিলিফাই করা হয়। বিএনপি এবং লীগ কেউই জামাতের সাথে জোট করার মধ্যে যেমন সমস্যা দেখে নাই তেমনি প্রয়োজনে তাদেরকে ভিলিফাই করতেও সমস্যা দেখে না।

জুলাই অভ্যুত্থানে জামাত ইসলামের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানে একটা নতুন শর্ত তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পরিপক্কতা হলো এই নতুন শর্তকে পড়তে পারার এলেম অর্জন করা। এই ছবির অংশগ্রহণকারীদের আমার কাছে মনে হয়েছে এখানে একটা পরিপক্কতার ঘাটতি দেখা গেছে।

রাজনীতিতে ব্যক্তি কোন লেন্স নিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নিবে সেটা নির্ভর করে ব্যক্তি কোন শ্রেণীতে বিলং করে অনেকখানি তার ওপর। এইখানে যে ছয়জন আছেন তারা প্রত্যেকেই আরবান সুশীল শ্রেণীতে বিলং করেন। আরবান সুশীল শ্রেণীর সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সংকট দুটোই হল, এরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সাংঘাতিক রকম সোশ্যাল প্রেসার ক্রিয়েট করতে পারে। জামাতের সাথে জোট করা বিরোধী অবস্থান যত বেশি না এই পাঁচজন তাদের চিন্তার এজেন্সিতে নিয়েছে, আমার কাছে মনে হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি এটা তারা সোশ্যাল প্রেসারে ইনফ্লুয়েন্স হয়েছে। যত বেশি না এটা তাদের জন্য রাজনৈতিক জরুরত তার চেয়ে অনেক বেশি তাদের যে রাজনৈতিক সমাজ, যে রাজনৈতিক সমাজে তারা বিচরণ করে সেখানে “তারা মুখ দেখাবেন কিভাবে?” এই বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

এটা ছাড়াও আমাদের প্রচলিত প্রগতিশীল সমাজে জামাত বিরোধিতা এক ধরনের রাজনৈতিক গ্ল্যামার বহন করে। জামাত শিবির বিরোধিতা যতখানি না দেশ প্রেম তার চেয়ে অনেক বেশি এটা গ্লামার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান। আমার কাছে মনে হয়েছে রাজনৈতিক গ্ল্যামার অনেকখানি ট্র্যাপ হিসেবে কাজ করেছে।

এবং মুজিববাদী মিডিয়ার জন্য জামাত বিরোধিতা অসম্ভব ডিজায়রেবল একটা অবস্থান। যেমন উদাহরণ হিসেবে দেখবেন গতবছর নারী-পুরুষের পৈত্রিক সম্পত্তিতে মালিকানা সমান কিনা, কিংবা নারী আর পুরুষ সমান কিনা এই ধরনের প্রশ্ন করে সামান্থা শারমিনকে মিডিয়ায় নিয়ে যেয়ে হর হামেশাই বিব্রত করা হয়েছে, হেনস্থা করা হয়েছে এবং এক অর্থে তাকে ডিফেইম করা হয়েছে। মুজিববাদী মিডিয়ার একটা প্রগতিশীল প্রেসক্রিপশন আছে। সেই প্রেসক্রিপশনে গত বছর সামান্থা শারমিন ছিল খলনায়িকা। কেন? কারন সামান্থা শারমিন এই মুজিববাদী মিডিয়ার রিকোয়ারমেন্ট অনুযায়ী উত্তর করত না।

এই বছরে এসে ঘটনাটা ঠিক উল্টে গেছে। এই মিডিয়া গুলোরই দেখবেন যে সামান্তা শারমিনকে নিয়েই টানা হেচরা পড়ে গিয়েছিল নির্বাচনের সময়, আগে ও পরে। এবং বেশিরভাগ মিডিয়াতে সামান্তা শারমিনকে হিউজ স্পেস দেয়া হয়েছে শুধুমাত্র এন সি পি জামাত জোট বিরোধী কথা বলার জন্য। কেন? কারণ মুজিব বাদি মিডিয়ার প্রেসক্রিপশনে‌ এটা ফিটি ইন হয় এবং তারা যা শুনতে চায় সামান্থা শারমিন এনসিপি জামাত বিরোধিতা বিষয়ে ঠিক সেই বক্তব্যগুলোই হাজির করছিলো। তিনি তাই বলছেন যা যা আমাদের মিডিয়ারা শুনতে চায়। সেই কারণেই গত বছরে খলনায়িকা সামান্থা শারমিন এইবার মিডিয়ায় সুপারহিট আলোচক সামান্থা শারমিন।

এই ছবিটা যে দোষে দুষ্টু সেটা হচ্ছে “আমরা যা ভাবছি সেটাই ঠিক ভাবনা”। এই অবস্থানটা প্রচন্ড কন্ডাসেন্ডিং একটা অবস্থান।

আরো অনেকগুলো পয়েন্ট ছিল কিন্তু লেখা তাহলে আরো অনেক বড় হয়ে যাবে।

সর্বশেষে, একটা রাজনৈতিক দল হচ্ছে একটা কালেক্টিভ বা যৌথ প্রক্রিয়া। এখানে যৌথ চিন্তা এবং যৌথ প্রক্রিয়ার মধ্যে ব্যক্তি চিন্তা অথবা গ্রুপ চিন্তাকে মাঝেমধ্যে কম্প্রোমাইজ করতে হয়। এবং এই কম্প্রোমাইজটা কখনো কখনো প্রচন্ড আনকম্ফোর্টেবল। এবং চিন্তার ডিসকমফোর্ট তৈরি করে। এইটাকে পার্টি বা ব্যক্তির প্রতি লয়ালিটি বলে না। এটা হচ্ছে রাজনীতি বা প্রক্রিয়াটাল প্রতি কমিটমেন্টের প্রশ্ন। এটা জরুরী না যে এই মুহূর্তে আমি যা ভাবছি সেটাই সঠিক অথবা উত্তম ভাবনা। কালেক্টিভের ভাবনা যদি তাৎক্ষণিকভাবে আমার উত্তম ভাবনার চেয়ে তুলনামূলকভাবে নিম্ন ভাবনাও হয়, তারপরও দল গঠনে প্রয়োজনে কালেক্টিভের ভাবনা অথবা দলের শক্তি অর্জন করার ভাবনা, প্রায়োরিটি পায় পাওয়া উচিত। আবার পার্টি খুব গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে হতেই পারে শুধুমাত্র গুটি কয়েক নেতৃত্ব একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে এই প্রক্রিয়াটা আসলেই গণতান্ত্রিক হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতি হয়তো সেটা বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে। দল গঠনের ক্ষেত্রে এরকমের বহুবিধ শর্ত তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক হচ্ছে, সাংগঠনিক হচ্ছে এই সমস্ত শর্তগুলোকে পড়তে পারার পরিপক্কতা অর্জন করা।

( সংযুক্তি এই ছবির প্রতিটা নারীকে আমি ভালোবাসি)

দিলশানা পারুল (ফেইসবুক স্ট্যাটাস থেকে সংগ্রহিত)

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এনসিপি-জামায়াত জোটে ভাঙনের গুঞ্জন

একমি ল্যাবরেটরিজের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রতিষ্ঠাতা হামিদুর রহমান সিনহা

মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলে যেসব সমস্যা হতে পারে

মির্জা ফখরুলই হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি

বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪ টুথপেস্টের ২৬টিতেই মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক

১৮ জনের মধ্যে ১২ রাষ্ট্রপতিই মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।

সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগপত্রঃ একটি জটিল এবং ধূর্ত মনস্তাত্ত্বিক দলিল!?

নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন কীভাবে

ফার্মেসী ব্যবসার জন্যে লাইসেন্সসহ যা যা লাগবে

নতুন ফার্মেসি ব্যবসার প্রথম ধাপ: কীভাবে করবেন ড্রাগ লাইসেন্স?

১০

পঞ্চদশ সংশোধনী: কেন এসেছিল, কী বদলেছিল, কেন আবার আলোচনায়?

১১

ইতিহাস ও নিসর্গের অপূর্ব মেলবন্ধন ‘বলধা গার্ডেন’

১২

যে পিৎজা বাঁচাল একটি প্রাণ: ডমিনোজের কর্মীদের ছোট্ট মানবিকতার বড় গল্প

১৩

বন্যা ও পানিতে ডুবে মৃতদের দাফনের নিয়ম

১৪

সোনালী অতীতের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র: সিরাজুল ইসলাম ও রানী সরকার

১৫

হালান্ডকে নিয়ে অজানা কিছু কথা

১৬

হলান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিলকে কাঁদিয়ে শেষ আটে নরওয়ে

১৭

মুক্তচিন্তার পথিক: মুস্তাফা মনোয়ার

১৮

পাসপোর্ট এল কেমন করে

১৯

পাসপোর্টের কোন রং দিয়ে কী বোঝায়

২০