মাঈন উদ্দিন সরকার,গণমাধ্যম কর্মীঃ
বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগতে মফস্বল সাংবাদিকরা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। রাজধানীর বাইরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাস্তব চিত্র, মানুষের সমস্যাবলি ও উন্নয়নধারা তারা সামনে নিয়ে আসেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের অধিকাংশ মফস্বল সাংবাদিক বছরের পর বছর শুধুমাত্র একটি আইডি কার্ড নিয়ে কাজ করেন, অথচ নিয়মিত বেতন পান না। এভাবে সাংবাদিকতা করাকে অনেকেই পেশা নয় বরং আত্মত্যাগ বলে মনে করেন।
অধিকাংশ জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকা মফস্বলে প্রতিনিধি নিয়োগ দিলেও তাদের জন্য কোনো চাকরির চুক্তি করে না। সাংবাদিকদের হাতে একটি আইডি কার্ড তুলে দিয়ে বলা হয়—“এখন তুমি আমাদের প্রতিনিধি।”কাজের চাপ থাকে অগাধ—সংবাদ পাঠানো, ছবি তোলা, অনলাইনে খবর পাঠানো ইত্যাদি। অথচ বিনিময়ে কোনো মাসিক বেতন বা ভাতা দেওয়া হয় না।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দায় এড়িয়ে যায় মালিক পক্ষ – বেতন দিলে মালিকপক্ষকে শ্রম আইন মানতে হয়, তাই আইডি কার্ড দিয়ে দায় সারা হয়। এছাড়াও নিবন্ধন হীন অনেক পত্রিকা,অনলাইন নিউজ পোর্টালও শুধুমাত্র আইডি কার্ড দিয়ে মফস্বলের সংবাদ সংগ্রহের কাজে সাংবাদিক নিয়োগ দিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তা কতটুকু বৈধ বা অবৈধ সে প্রশ্ন তো রয়েই যায়।
তবে হ্যাঁ, সাংবাদিক পরিচয়ের সামাজিক মর্যাদা আছে বলে অনেকেই বেতন ছাড়াই সাংবাদিক পরিচয় ধরে রাখতে চান। মফস্বল সাংবাদিকরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কাজ করেন, তাই মালিকপক্ষকে চাপে আনা সম্ভব হয় না। অনেক আঞ্চলিক পত্রিকা আর্থিক দুরবস্থার অজুহাতে বেতন দিতে চায় না।
অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী কোনো শ্রমিককে বিনা মজুরিতে কাজ করানো যাবে না। সংবাদপত্র কর্মচারী (সেবার শর্ত) আইন, ১৯৭৪ অনুসারে সাংবাদিকদের জন্য ওয়েজ বোর্ড বেতন বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, শুধু আইডি কার্ড দিয়ে সাংবাদিক নিয়োগ করা আইনসঙ্গত নয়। বেতন বিহীন শুধুমাত্র কার্ডধারী হিসেবে মফস্বলে অনেকে এ পেশায় কাজ করার ফলে মেধাবী ও যোগ্য সাংবাদিকরা টিকে থাকতে পারেন না। সাংবাদিকদের বাস্তব জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সাংবাদিকতা পেশার মান নষ্ট হয়।
বেতন না থাকায় কেউ কেউ স্থানীয় প্রভাবশালী বা বিজ্ঞাপনদাতার প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন—ফলে নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ হয়।
বাংলাদেশে বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকদের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে কঠিন। অনেকেই বছরের পর বছর শুধু আইডি কার্ড, পরিচয় ও সম্মান দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, অথচ নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। এরপরও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়,কেন মফস্বল সাংবাদিকরা বেতন ছাড়া টিকে থাকেন?
অনেক পত্রিকা মালিক “প্রতিনিধি” বানিয়ে শুধু একটা আইডি কার্ড দেয়। এতে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়া যায়, কিন্তু কোনো বেতন দেওয়া হয় না।
সমাজে “সাংবাদিক” পরিচয়ের আলাদা মর্যাদা আছে। অনেকে এই পরিচয়ের কারণে সম্মান, প্রভাব বা সুযোগ সুবিধা পান—যদিও বেতন পান না। অনেকেই সাংবাদিকতার পাশাপাশি অন্য কাজ (শিক্ষকতা, ব্যবসা, ফ্রিল্যান্স কাজ) করে জীবন চালান। আইডি কার্ড থাকায় স্থানীয়ভাবে বিজ্ঞাপন, অনুষ্ঠান কাভারেজ, এমনকি কিছু আর্থিক সুবিধা পান। এভাবেই একজন মফস্বল সাংবাদিক দিনের পর দিন চরম বাস্ততার সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকেন। সাংবাদিকরা আর্থিক অনিশ্চয়তায় থাকেন। প্রকৃত যোগ্য সাংবাদিকরা টিকে থাকতে পারেন না, অনেক সময় বিকল্প আয়ের জন্য নৈতিকতা বিসর্জন দিতে বাধ্য হন।সংবাদপত্রের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাস্তবিক অর্থে, অনেক মফস্বল সাংবাদিক ব্যক্তিগত আয়ের উৎস (ব্যবসা, টিউশন, চাকরি + সাংবাদিকতার পরিচিতি—এই মিশ্রণে জীবন চালান। তবে আইন অনুযায়ী, বেতন ছাড়া সাংবাদিক নিয়োগ কি বৈধ? মালিক পক্ষের কাছে এ জোরালো প্রশ্নটি করতেই হয়। মফস্বল সাংবাদিকদের আত্মত্যাগের ইতিহাস কি মালিকপক্ষ কোনদিন লিখবে? সাংবাদিকতা পেশাকে মনে প্রাণে ভালোবেসে হৃদয়ে ধারণ করে মফস্বল সাংবাদিকদের মধ্যে অনেকেই বেতনবিহীন সাংবাদিকতা করে দিনের পর দিন চরম অনিশ্চয়তায় জীবন কাটায়। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? কবে মফস্বল সাংবাদিক ভাগ্য প্রসারিত হবে?
এ দেশের মফস্বল সাংবাদিকরা দেশের প্রকৃত চিত্র জাতির সামনে তুলে ধরেন, অথচ নিজেরা রয়ে যান বেতনহীনতার দুষ্টচক্রে। এটি কেবল তাদের প্রতি অবিচার নয়, বরং পুরো গণমাধ্যমের প্রতি আঘাত। তাই দায়িত্বশীলদের এখনই সময়—শুধু আইডি কার্ড দিয়ে নয়,সংবাদপত্রের যথাযথ নিয়ম মেনে মফস্বল সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম বেতন নিশ্চিত করা এবং তাদের মর্যাদার সঙ্গে সাংবাদিকতা করার সুযোগ তৈরি করা।
লেখক-
মাঈন উদ্দিন সরকার,
মফস্বল গণমাধ্যমকর্মী;
বি.এ অনার্স,এম.এ মাস্টার্স ( বাংলা বিভাগ )
কেন্দুয়া-নেত্রকোনা।
মন্তব্য করুন