সমাজে নারীর প্রতিবন্ধকতা | bdsaradin24.com
জুথি পাল,উদ্যোক্তা
১৬ মে ২০২২, ১১:০৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

সমাজে নারীর প্রতিবন্ধকতা

‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব, গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’-২০২১ সালের নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য এটি। ১৯৭৫ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে এই নারী দিবস। নারীর সম অধিকারসহ নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে অনেক সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করে আসছে। “নারীর যথাযথ সম্মান প্রদর্শন” করার কথা উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে গ্রামের সালিশ  সর্ব স্তরেই বলা হয়। কিন্তু মানা হয় কি? হয় না।

আমরা চোখে যেটা দেখতে পাই সেটা কি করে অবিশ্বাস করি। আমরা দেখি দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সব জায়গাতে নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। কিন্তু সেটা কত শতাংশ??  দেশের জনগনের ৫০% নারী রয়েছে। কিন্তু সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে  নারীর সংখ্যা হাতে গোনা।

সামাজিক ভাবে নারীরা অতীত কাল থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছে। আর অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়া একটা মেয়েকেও আমাদের সমাজে স্বামীর কাছে অর্থ খরচের জবাবদিহিতা করতে হয়। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নাম মাত্র পদ রয়েছে নারীর। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ অনেকটা মহাভারতের অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের রাজ্য শাসনের মতোই।

সমাজের প্রাথমিক স্তর বলতে পরিবারকে বোঝনো হয়। নারী যেখানে বড় হয়ে ওঠে, যেখানে তার সবচেয়ে বেশী মুক্ত বিচরণ সেখথেকেই নারীর প্রতিবন্ধকতা শুরু। নারী পরিবার থেকেই সর্ব প্রথম নির্যাতনে শিকার হয়। এরপর রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্ষেত্র, যেখানে একের পর এক নারী লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় কোথাও মেয়েরা নিরাপদ নয়। চাকরী ক্ষেত্রে হচ্ছে যৌন নির্যাতনের শিকার। এরপর রয়েছে রাস্তায়, পাড়ায় পাড়ায় ইভটিজিং, রয়েছে বাসচালক, ড্রাইভারের মতো শকুনের দৃষ্টি। যা আমরা বিগত বছরগুলোর নিউজফিড ঘুরলেই পেয়ে যাবো। যেখানে উন্নত দেশগুলোতেও মেয়েদের পায়ে শেকল পড়ানো সেখানে বাংলাদেশের মতো অশিক্ষিত ও কুসংস্কারযুক্ত সমাজের কথা বলার অপেক্ষা থাকে না।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই অবস্থা আরও ভয়াবহ। ফেইসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম সহ সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে মেয়েদের পোস্ট, ছবিতে এমন ভাবে আক্রমনের স্বীকার হতে হয় যে, মেয়েদের প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সামাজিক প্রতিবন্ধকতা হিসাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখানে বৃহৎ ভূমিকা পালন করছে।

মেয়েরা গান, নাচ, কবিতা আবৃত্তি, অভিনয় এগুলোতে সমান সুযোগ পায় না। সমাজের যেসকল ব্যক্তি সম্মানিত স্থান দখল করে আছে তারা মেয়েদের মানসিক বিকাশ হতে দেয় না। ধর্মীয় গোড়ামী এর অন্যতম কারন।

মেয়েরা যাতে নিরাপদে থাকতে পারে সেজন্য ধর্মীয়  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হলেও বিগত বছর গুলোর নানা রকম ঘটনা থেকে বুঝতে পারি ধর্মীয় শিক্ষা  প্রতিষ্ঠান গুলোও মেয়েদের জন্য নিরাপদ নয়। পরিবার থেকেই মেয়েদের বেশী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। কখনও ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরা মাঠে গিয়ে খেলার সুযোগ পায় না বা একটা ছেলের মতো ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট গুলো ব্যবহারের সুযোগ পায় না মেয়েরা। পৃথিবী মেয়েদের জন্য বিশাল সুযোগ করে দেওয়া স্বত্বেও নিজের পরিবারের সদস্যরাই তাকে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে।

বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর খুব কম মেয়েই সুযোগ পায় নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী ক্যারিয়ার সাজাতে। যদিও বা সুযোগ পায় বাচ্চা হওয়ার পর মেয়েরা নিজে থেকেই আগ্রহী হয় না বাইরে যেতে। কিছু মেয়ে যখন অনেক বেশী সোচ্চার থাকে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে তখন সহ্য করতে হয় নানা রকম পারিবারিক চাপ। যেটা একটা শিক্ষিত পরিবার ও অশিক্ষিত পরিবারের চিত্র অনেকটাই অভিন্ন।

স্বামীসহ শ্বশুর বাড়ির লোকের কথামত চলতে চাইলে অনেক মেয়ের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায় আবার যদি কোন মেয়ে নিজের ক্যারিয়ারকে বেশী গুরুত্ব দেয় তবে তার সংসারটা শেষ হয়ে যায়। ফলে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে চলে আসে সেপারেশন। এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে আমাদের সমাজে।

একজন মা যখন উদ্যোক্তা হয় তখন স্বাভাবিক ভাবেই তাকে সন্তান, সংসারের দেখাশোনা করেই উদ্যোগ পরিচালনা করতে হয়। কিন্তু এতেও পারিবারিক চাপ সহ্য করতে হয়। সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়।

পরিবার কিছুতেই বুঝতে চায় না একটি সদ্য জন্ম নেওয়া উদ্যোগে কতোটা সময় দিতে হয়। একটি উদ্যোগ একজন উদ্যোক্তার নিকট নিজের সন্তানের মতোই। উদ্যোগটি যাতে বড় হওয়ার সুযোগ পায়, মাঝ পথে গিয়ে থামিয়ে দিতে না হয় তার জন্য একজন উদ্যোক্তাকে অনেক বেশী দক্ষতা আর জ্ঞান অর্জন করতে হয়। পরিবারের সদস্যদের অসহযোগিতা এবং প্রতিবেশীদের নানা রকম বাজে মন্তব্য সব সময় একজন নারী উদ্যোক্তার জন্য প্রতিবন্ধকতা। এমন সামাজিক ও পারিবারিক চাপে অনেক স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় মাঝ পথে।

অনার্স মাস্টার্স শেষ করে মেয়ে নাকি শাড়ি বিক্রি করে, মেয়ে বাসায় হোটেল খুলে বসেছে, মেয়ে মাছও নাকি বিক্রি করে অনলাইনে। এমন অনেক মন্তব্য শুনতে হয় নারী উদ্যোক্তাকে। বাড়ির বৌ ব্যবসা করে মানুষ শুনলে কি বলবে এমন কথায় একজন উদ্যোক্তার মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।

একজন নারীর এমন হাজারো সামাজিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে যা সত্যি নারীর প্রতি বৈষম্য ছাড়া আর কিছু না। সমাজ গঠনে নারীরও যে অবদান রয়েছে সমাজ আজও মেনে নিতে পারে না। লেখাপড়া, চাকরি, ব্যবসা সব ক্ষেত্রেই নারীর সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বিরাজ করে। নারী মুক্তির গান কবিতা স্লোগান নিয়ে নারী মুক্তিবাদিরা গলা ফাটালেও সমাজ নারীর গলা চিপে ধরে রেখেছে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জামায়াত-এনসিপির জোট নির্বাচন বর্জন করছে!

মাহাথিরের দীর্ঘ ও সফল জীবনের রহস্য

সেন্টমার্টিনে রিপ কারেন্ট ও বিপদজনক বিচ: পর্যটকদের জন্য জরুরি সতর্কতা

জুলাই যোদ্ধা সুরভী তাহরিমা মুক্ত!

ওবায়দুল কাদের ভেন্টিলেশনে, অবস্থা সংকটাপন্ন

অনৈতিক প্রস্তাব, রাজিনা হওয়ায় চাঁদাবাজি মামলায় ফাঁসানো হয় সুরভীকে

ঢাকা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী অন্তরা হুদার মনোনয়ন বাতিল

ঢাকা-৯ আসনে তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বাতিল

ঢাকায় রহস্যময় দেয়ালচিত্র : সুবোধ

এনইআইআর চালু হচ্ছে আজ, বন্ধ হয়ে যাবে যেসব হ্যান্ডসেট

১০

কঠিনতম মুহূর্তেও রাজনৈতিক শালীনতার দৃষ্টান্ত রাখলেন তারেক রহমান

১১

যেভাবে জানবেন আপনার ভোট কেন্দ্রের নাম

১২

খালেদা জিয়ার মৃত্যু কি আগেই হয়েছিল? মেডিকেল সাইন্স কি বলে?

১৩

ফয়সাল করিম মাসুদের ভাইরাল ভিডিও নিয়ে দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণ

১৪

খালেদা জিয়ার জানাজা ঘিরে ঢাকার যেসব সড়ক এড়িয়ে চলবেন আজ

১৫

খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য এক রাজনৈতিক জীবন

১৬

তারেক রহমান কি পারবেন তিন প্রজন্মের সেতুবন্ধন হতে?

১৭

আই হ্যাভ এ প্ল্যান : তারেক রহমান

১৮

জামায়াতের সঙ্গী হতে যাচ্ছে এনসিপি!

১৯

কেন তারেক রহমানের দেশে ফেরা ভারতের জন্য সুসংবাদ?

২০