হাসিনাকে ফেরত দিচ্ছে না দিল্লি! | bdsaradin24.com
ডেস্ক নিউজ
২১ অক্টোবর ২০২৪, ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

হাসিনাকে ফেরত দিচ্ছে না দিল্লি!

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থান করায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ক্রমেই জটিল হচ্ছে। রাজনৈতিক কারণেই দিল্লি শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে। আবার রাজনৈতিকভাবে দুই দেশ ঐকমত্যে পৌঁছলেই দিল্লি হাসিনাকে ঢাকার কাছে হস্তান্তর করবে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে না বলে বার্তা দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত ৫ আগস্ট থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। এরপর থেকেই স্পর্শকাতর এ ইস্যুতে নজর রাখছেন ঢাকার কূটনীতিকরা। যেকোনো সময়ে দিল্লির কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইতে হতে পারে, এমন বিষয় মাথায় রেখে এরই মধ্যে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন ঢাকার কূটনীতিকরা। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে গত বৃহস্পতিবার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এ মুহূর্তে ঢাকার পুলিশের হাতে রয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। আমলাতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা সেরে তা খুব দ্রুত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতার জন্য পাঠানোর কথা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তৌফিক হাসান রোববার সাংবাদিকদের বলেন, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ (স্বরাষ্ট্র বা আইন মন্ত্রণালয়) থেকে এখনও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কোনো আবেদন আসেনি।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে আমরা অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। আদালত এক মাস সময় দিয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে তাকে ফেরত আনার জন্য যা যা প্রয়োজন সেটি অবশ্যই করব আমরা।
তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনাকে কোন প্রক্রিয়ায় আনা হবে বা কীভাবে আনা হবে সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো কোর্ট বলেছে তাদের গ্রেফতার করতে। পরোয়ানা তো আমাদের কাছে আসেনি, এসেছে পুলিশের কাছে। কিন্তু পুলিশ সেটি পারবে না, কারণ তিনি দেশে নেই। যখন আমাদের কাছে আসবে তখন দেখা যাবে। শেখ হাসিনা ইস্যুতে সবশেষ গত শনিবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী রাজশাহীতে বলেন, এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান চুক্তি ফলো করা হবে।
যেকোনো অপরাধীকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশ-ভারত গত ২০১৩ সালে একটি চুক্তি করেছে। দিল্লি থেকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ২০১৩ সালের চুক্তি অনুসরণ করবে বাংলাদেশ। ওই চুক্তি গত ২০১৬ সালে সংশোধন করা হয়। চুক্তির ১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, বাংলাদেশ ও ভারত তাদের ভূখণ্ডে কেবল সেই ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণ করতে বাধ্য, যারা প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ করেছেন। প্রত্যর্পণ চুক্তির অনুচ্ছেদ ১০ ধারায় বলা আছে, এ চুক্তির আওতায় প্রত্যর্পণ চাওয়ার জন্য অনুরোধকারী রাষ্ট্রের পক্ষে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানাও যথেষ্ট। চুক্তির অনুচ্ছেদ ৮ ধারায় বলা আছে, যদি একজন ব্যক্তি প্রত্যপর্ণের জন্য অনুরোধকৃত রাষ্ট্রকে বোঝাতে পারেন যে, তাকে হস্তান্তর করা হলে দেশে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন না এবং তাকে প্রত্যর্পণ করাটা নিপীড়নমূলক হবে, তা হলে অনুরোধকৃত রাষ্ট্র সব পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাকে প্রত্যর্পণ করা থেকে বিরত থাকতে পারে। এ অনুচ্ছেদ অনুসারে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ‘ন্যায়বিচারের স্বার্থে সরল বিশ্বাসে’ করা হয়নি বলে জানাতে পারবে অনুরোধকৃত রাষ্ট্র। আবার চুক্তির অনুচ্ছেদ ২১ ধারা অনুযায়ী, ভারত যেকোনো সময় নোটিস দিয়ে এ চুক্তি বাতিল করতে পারবে।
এদিকে শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়ার পর ভারতের সংসদের উচ্চ কক্ষ রাজ্যসভায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত ৬ আগস্ট বলেন, গত ৫ আগস্ট স্বল্পসময়ের নোটিসে শেখ হাসিনা সাময়িকভাবে ভারতে আসার অনুমতি চান এবং বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ফ্লাইট ক্লিয়ারেন্সের জন্যও অনুরোধ আসে। এমন বাস্তবতায় শেখ হাসিনা গতকাল (৫ আগস্ট) সন্ধ্যায় দিল্লি পৌঁছেন। সবশেষ গত ১৭ অক্টোবর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দেশটির মুখপাত্র বলেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানের বিষয়ে আমি আগেই বলেছিলাম যে, তিনি স্বল্প সময়ের নোটিসে এখানে এসেছিলেন এবং তিনি এখানেই রয়েছেন।
শেখ হাসিনার দিল্লি অবস্থান নিয়ে ভারত এরই মধ্যে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে যথাযথ সম্মানের সঙ্গে শেখ হাসিনাকে ভারত তাদের একজন বন্ধু হিসেবেই আশ্রয় দিয়েছে এবং শেখ হাসিনা সেখানেই রয়েছেন। বাংলাদেশের নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের মো. জসীম উদ্দিনের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা জানান, তাদের বৈঠকে শেখ হাসিনা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়নি। এদিকে শেখ হাসিনা এবারই প্রথমবারের মতো দিল্লির আশ্রয় নেয়নি। এর আগেও পঁচাত্তর সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বিগত ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রায় ছয় বছর শেখ হাসিনা দিল্লির আশ্রয়ে ছিলেন। তখনও ভারত তাকে যথাযথ সম্মানের সঙ্গে আশ্রয়ে রেখেছিল। শেখ হাসিনা ছাড়াও তিব্বতের ধর্মগুরু দালাই লামা এবং আফগান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহর স্ত্রী-সন্তানসহ এশিয়ার একাধিক নেতাকে আশ্রয় দিয়েছে ভারত। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই শেখ হাসিনাকে ঢাকা দিল্লি থেকে সহজে ফেরত পাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে জানায়, বিশেষ পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে ভারতে আসতে হয়েছে। এমন প্রক্রিয়ায় যেকোনো অতিথিকেই কিছু ‘ডিব্রিফিং সেশন’-এর মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এখন তার কাছ থেকে ভারত কী (ডুজ অ্যান্ড ডোন্টস) প্রত্যাশা করছে, তার কোনটা বলা উচিত বা কোনটা বলা উচিত নয় বলে মনে করছে, এসব সেশনে ভারতের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাকে সে ব্যাপারে ব্রিফ করেছেন এবং তার কাছ থেকেও ‘নোটস’ নিয়েছেন।
ভারতের জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক শ্রীরাধা দত্ত সময়ের আলোকে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত তাদের একজন বন্ধু হিসেবেই যথাযথ সম্মানের সঙ্গে আশ্রয় দিয়েছে। কেননা ভারতের কাছে বাংলাদেশের শেখ হাসিনা হচ্ছে আস্থার জায়গা। যার ওপর ভারত নির্ভর করতে পারে। এ জন্যই ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে। এখন আইনি প্রক্রিয়ায় ঢাকা দিল্লির কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইতে পারে। ফেরত চাওয়ার অনুরোধ এলে তখন দেখা যাবে। তবে আমার মনে হয় না যে, ঢাকার অনুরোধ এলেই দিল্লি হাসিনাকে ফেরত দেবে। এ ছাড়া এর আগেও শেখ হাসিনা ভারতের আশ্রয়ে ছিলেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এবং সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, শেখ হাসিনাকে দিল্লি থেকে ফেরত আনা একটা রাজনৈতিক বিষয়। ভারত যতদিন মনে করবে ততদিন তারা শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে না। শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত আনতে হলে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক বোঝাপড়া হতে হবে। যা এ সময়ের বাস্তবতায় অনুপস্থিত। ভারত জেনেবুঝেই শেখ হাসিনাকে সেখানে আশ্রয় দিয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. খলীলুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, বিষয়টি অনেক স্পর্শকাতর। বিষয়টি এখনও কোর্ট আর পুলিশের মধ্যে রয়েছে। এর বাইরে এলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার বিষয়টি মাত্র শুরু হলো। সামনে আরও অনেক দেখার বিষয় আছে। গত সরকারের সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি হয়েছে। ফেরত আনতে হলে এ চুক্তির মাধ্যমেই সমাধান হতে হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. শহীদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত ফেরত দেবে না। কারণ ভারত বন্ধুত্ব করেছে শেখ হাসিনার সঙ্গে, বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে করেনি। ভারত বিগত ২০০৩ সাল থেকে চেষ্টা করছিল যেন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসেন। তবে শেখ হাসিনাকে ফেরত না দিলে ভারতেরই বেশি ক্ষতি হবে। ভারত তাদের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেগুলো বাধাগ্রস্ত হবে।
Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জামায়াত-এনসিপির জোট নির্বাচন বর্জন করছে!

মাহাথিরের দীর্ঘ ও সফল জীবনের রহস্য

সেন্টমার্টিনে রিপ কারেন্ট ও বিপদজনক বিচ: পর্যটকদের জন্য জরুরি সতর্কতা

জুলাই যোদ্ধা সুরভী তাহরিমা মুক্ত!

ওবায়দুল কাদের ভেন্টিলেশনে, অবস্থা সংকটাপন্ন

অনৈতিক প্রস্তাব, রাজিনা হওয়ায় চাঁদাবাজি মামলায় ফাঁসানো হয় সুরভীকে

ঢাকা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী অন্তরা হুদার মনোনয়ন বাতিল

ঢাকা-৯ আসনে তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বাতিল

ঢাকায় রহস্যময় দেয়ালচিত্র : সুবোধ

এনইআইআর চালু হচ্ছে আজ, বন্ধ হয়ে যাবে যেসব হ্যান্ডসেট

১০

কঠিনতম মুহূর্তেও রাজনৈতিক শালীনতার দৃষ্টান্ত রাখলেন তারেক রহমান

১১

যেভাবে জানবেন আপনার ভোট কেন্দ্রের নাম

১২

খালেদা জিয়ার মৃত্যু কি আগেই হয়েছিল? মেডিকেল সাইন্স কি বলে?

১৩

ফয়সাল করিম মাসুদের ভাইরাল ভিডিও নিয়ে দ্য ডিসেন্টের বিশ্লেষণ

১৪

খালেদা জিয়ার জানাজা ঘিরে ঢাকার যেসব সড়ক এড়িয়ে চলবেন আজ

১৫

খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য এক রাজনৈতিক জীবন

১৬

তারেক রহমান কি পারবেন তিন প্রজন্মের সেতুবন্ধন হতে?

১৭

আই হ্যাভ এ প্ল্যান : তারেক রহমান

১৮

জামায়াতের সঙ্গী হতে যাচ্ছে এনসিপি!

১৯

কেন তারেক রহমানের দেশে ফেরা ভারতের জন্য সুসংবাদ?

২০